দ্বিতীয় মেয়াদের ক্ষমতার টেবিলে বসার দুই বছরের মাথায় এক ভয়ানক ও রাজনৈতিকভাবে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন রাজনীতি ও বিশ্ব ভূগোলে যাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এতদিন একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে এবার ব্যালট বাক্সে চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন খোদ আমেরিকান নাগরিকেরা।
মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষ—সিনেট এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস—উভয় জায়গাতেই রিপাবলিকান পার্টির চরম পরাজয় ট্রাম্পের ক্ষমতার ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছে। শুল্কের বেড়াজাল, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং হঠকারী সামরিক পদক্ষেপের যাঁতাকূপে পিষ্ট হওয়া সাধারণ ভোটারদের এই গণভোট বিশ্বজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ভোটের প্রাথমিক ফলাফল হাতে পাওয়ার পর ট্রাম্প প্রথমে তা মেনে নেওয়ার কথা বললেও, পরবর্তীতে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ হ্যান্ডেলে লাল টুপি পরিহিত ছবির ওপর বড় করে “ভেটো” লিখে নিজের জেদ বজায় রেখেছেন।
এমনকি ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, অভিবাসনের মতো কিছু ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করলেও যেকোনো "অযৌক্তিক" বিলে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ভেটো প্রয়োগ করবেন। তবে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির সেই ক্যাপিটল হামলার অন্ধ আক্রোশের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে, কারণ এবার লড়াইটা ব্যালটের মারপ্যাঁচে খোদ হোয়াইট হাউসের একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প শিবিরকে খেসারত দিতে হয়েছে তাদের একের পর এক ভুল নীতির কারণে। ২০২০ সালের পর এটিই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়। যে রিপাবলিকান ঘাঁটিগুলোকে ‘রেড স্টেট’ বা নিজেদের সুনিরাপদ দুর্গ বলে মনে করা হতো, সেই রাজ্যগুলো থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন সাধারণ সমর্থকরা। এর পেছনে কাজ করেছে মূলত অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাতে জর্জরিত আম জনতা—যাঁদের মধ্যে আফ্রিকান আমেরিকান, হিস্পানিক থেকে শুরু করে ভারতীয় বংশোদ্ভূতরাও রয়েছেন—বাজারের আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ডিম বা জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রামীণ জনপদে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ও জীবনযাত্রার খরচ যেভাবে লাগামছাড়া হয়েছিল, তা ট্রাম্পের পপুলারিটির মূলে আঘাত হেনেছে।
সবচেয়ে বড় বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে। নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প যে “অন্তহীন যুদ্ধ” বন্ধের ফুলঝুরি ফুটিয়েছিলেন, হোয়াইট হাউসে বসার পরপরই তিনি নিজেই তার উল্টোটা করে বসেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে টার্গেট করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসন এবং হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘ আট মাস ধরে চলা এই উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। ট্রাম্পের এই হঠকারী ও যুদ্ধংদেহী নীতি তার নিজস্ব ‘MAGA’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) সমর্থকদেরও চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে।
পাশাপাশি, প্রেসিডেন্টের পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্ফীত হওয়ার অভিযোগও ভোটাররা সহজে হজম করেননি। ক্রিপ্টোকারেন্সি চুক্তি, উপসাগরীয় অঞ্চলের নানা ফন্দিফিকির কিংবা পাকিস্তানে খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের মধ্য দিয়ে কেবল প্রথম বছরেই ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ২.২ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনায় ওয়াশিংটনের অন্দরে দুর্নীতির গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে তার অমানবিক ‘নাইস’ অভিযান এবং নির্বিচারে নারী-শিশুদের ঘরছাড়া করার নীতি আমেরিকান সমাজের বহুত্ববাদী কাঠামোর ওপর চরম আঘাত হেনেছিল।
চীন, কানাডা, মেক্সিকো কিংবা ভারতের ওপর নির্বিচারে শুল্ক বসানোর খেসারতও দিতে হয়েছে খোদ মার্কিন ভোক্তাদেরই, কারণ এই শুল্কের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষের ঘাড়েই। বিচার বিভাগের কণ্ঠরোধ এবং জেফ্রি এপস্টেইনের কেলেঙ্কারির মতো নৈতিক স্খলনও ট্রাম্পের কফিন শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক বিশাল ও বড় ধরনের মোড় নিতে চলেছে। বিশ্ববাসীর নজর এখন ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর দিকে:
মার্কিন কংগ্রেসে ট্রাম্পের ভরাডুবি ও ডেমোক্র্যাটদের পুনরুত্থান বাংলাদেশের উদীয়মান তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে; একদিকে ট্রাম্পের আগ্রাসী শুল্ক নীতির বিরোধিতায় ডেমোক্র্যাটরা সোচ্চার হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঢাকার জন্য সুবিধাজনক দরকষাকষির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে মানবাধিকার, সংখ্যালঘু অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার প্রশ্নে মার্কিন কংগ্রেসে কড়া নজরদারি বজায় থাকায় ঢাকার নীতিনির্ধারকদের জন্য কূটনৈতিক সতর্কতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেশনীতি ও যুদ্ধ পরিস্থিতি : অভ্যন্তরীণ চাপে কোণঠাসা হয়ে পড়া মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ঐতিহ্যগতভাবেই বিদেশনীতির মাঠে খড়্গহস্ত হন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের এই বেপরোয়া মনোভাব আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। তবে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস চাইলে যুদ্ধের তহবিল আটকে দিয়ে তার ডানা ছাঁটার চেষ্টা করতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ চলতে থাকলে ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিও বড় ধরনের ধাক্কা খাবে।
আইনি জালে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা : ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার অর্থ হলো ট্রাম্প এবং তার ব্যবসায়ী পুঁজিপতি বন্ধুদের বিরুদ্ধে এবার শুরু হবে কড়া তদন্ত। ক্রিপ্টো লেনদেন, রিয়েল এস্টেট ডিল এবং খনিজ সম্পদ চুক্তিগুলোর ময়নাতদন্ত শুরু হলে এর আঁচ গিয়ে পড়বে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যবসায়িক ফায়দা লোটা ভারতীয় বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপরও।
শুল্ক ও বাণিজ্য যুদ্ধ : ট্রাম্পের একচ্ছত্র শুল্ক আরোপের ক্ষমতা বিশ্ববাজারকে দীর্ঘকাল ধরে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। ওয়াশিংটন এখন তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে থাকায় ভারত সরকার চলমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নিজেদের দরকষাকষির চাল নতুন করে সাজানোর সুযোগ পাবে।
অভিবাসন ও ভিসানীতি : এইচ-১বি ভিসা, শিক্ষার্থী ভিসা বা ওপিটি নিয়ে চলা কঠোর বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে অভিবাসী ও করপোরেট আমেরিকার পক্ষ থেকে যে প্রবল প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে, তা হোয়াইট হাউসকে বাধ্য করবে সুর নরম করতে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভারতীয়-আমেরিকান ও কৃষ্ণাঙ্গ নেতাদের রাজনৈতিক উত্থান এই নীতিগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সমীকরণ : মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ ছাপিয়ে আগামী দিনে বেইজিং ও মস্কোর প্রতি ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, তা বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের গোপন বা প্রকাশ্য সমঝোতা আমেরিকার পুরনো মিত্রদের গভীর বিপদে ফেলতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি আধিপত্য : সেমিকন্ডাক্টর ও এআই ডেটা সেন্টার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরেই প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। চীনের ক্রমবর্ধমান রাষ্ট্রীয় এআই আধিপত্যের মোকাবিলায় ওয়াশিংটন এখন কী কৌশল নেয়, সেদিকেও বিশ্ববাসীর তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে।
ভারতের মানবাধিকার নিয়ে টানাপোড়েন : মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং সুশীল সমাজের ওপর সরকারের আচরণ নিয়ে ওয়াশিংটনের অন্দরে কড়া নজরদারি শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে এখন এই ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে বেশ সূক্ষ্ম ও জটিল কূটনৈতিক বোঝাপড়ায় যেতে হবে।
উত্তরসূরিদের দৌড়ঝাঁপ :২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াই ইতিমধ্যেই বেজে গেছে। রিপাবলিকান শিবিরে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও এখন থেকেই ট্রাম্পের বিতর্কিত ‘বোঝা’ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়ার কৌশল খুঁজছেন। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট শিবিরে বারাক ওবামার সহযোগিতায় তরুণ এক রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হয়েছে।
ওয়াশিংটনের মসনদে ট্রাম্পের এই রাজনৈতিক বিপর্যয় কেবল আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেই ওলটপালট করে দেয়নি, বরং ঢাকা, দিল্লি থেকে শুরু করে গোটা পৃথিবীর ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী ও প্রবল ঢেউ তুলে দিয়েছে। আগামী দুই বছর বিশ্ব কূটনীতির টেকিট কিবোর্ডে কোন নতুন চাল লেখা হবে, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা!
সান নিউজ / রাজীব