এক নজরে রিফ্লেক্ট অরবিটালের মহাকাশ প্রকল্প :
-
মূল উদ্যোগ: মহাকাশে প্রকাণ্ড আয়না বসিয়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছে দেওয়া এবং তা কেনাবেচা করা।
-
সংস্থার নাম: ক্যালিফোর্নিয়ার মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’ (Reflect Orbital)।
-
রকেট উৎক্ষেপণ চুক্তি: এই প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য ভারতের স্কাইরুট অ্যারোস্পেস (Skyroot Aerospace)-এর সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।
-
আয়নার আকৃতি: পৃথিবীর লো অরবিটে ১৮ মিটার বাই ১৮ মিটার আকারের বিশাল আয়না স্থাপন করা হবে।
-
পরিষেবা পাওয়ার উপায়: গ্রাহকরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের পছন্দমতো এলাকায় আলো চাইলে, সেই অনুযায়ী আয়নার দিক নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
-
প্রথম পরীক্ষা: ২০২৭ সালের মার্চের পরেই ‘ইয়ারেন্ডিল-১’ নামের স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রথম পরীক্ষাটি হবে, যা প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকায় আলো ফেলতে পারবে।
-
ভবিষ্যতের লক্ষ্য: ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশে ৫০ হাজার স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলির সম্মিলিত আলো চাঁদের আলোর সমান হবে।
-
প্রধান চ্যালেঞ্জ: পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অণু ও অ্যারোসলের কারণে আলোর বিক্ষেপণ ঘটে নির্দিষ্ট এলাকার বাইরেও চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।
-
সুবিধা: সূর্য ডোবার পরেও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন এলাকায় দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানো।
-
উদ্বেগ ও বিতর্ক: রাতের আকাশের স্বাভাবিক অন্ধকার নষ্ট হওয়া, জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় বাধা এবং পরিবেশ ও নিশাচর প্রাণীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় বিজ্ঞানীরা তীব্র আপত্তি তুলেছেন।
কল্পবিজ্ঞানের কোনো থ্রিলার সিনেমার দৃশ্য এখন বাস্তবায়নের পথে। দিনের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার পর রাতের আঁধার ভেদ করে যদি আপনার ঘরের জানলায় এসে পড়ে কৃত্রিম রোদের ঝিলিক, তবে কেমন লাগবে? শুনতে অদ্ভুত বা রূপকথার মতো মনে হলেও, ঠিক এমনটাই ঘটতে চলেছে অদূর ভবিষ্যতে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার উচ্চপ্রযুক্তি সংস্থা ‘রিফ্লেক্ট অরবিটাল’-এর হাত ধরে শুরু হতে চলেছে মহাকাশ থেকে সূর্যের আলো কেনাবেচার এক রোমহর্ষক ও বিতর্কিত অধ্যায়।
প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, পৃথিবীর কক্ষপথে (লো আর্থ অরবিট) স্থাপন করা হবে ১৮ মিটার লম্বা এবং ১৮ মিটার চওড়া প্রকাণ্ড কিছু মহাকাশীয় আয়না। এই জায়ান্ট আয়নাগুলোকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সূর্যের প্রতিফলিত রশ্মি ফেলে দেওয়া হবে পৃথিবীর নির্দিষ্ট কোনো অন্ধকার অঞ্চলে। ফলে রাতের বেলাতেও কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় সূর্যের আলোর ছোঁয়া পাওয়া সম্ভব হবে।
সংস্থার পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০২৭ সালের মার্চ মাসের পরই এই প্রযুক্তির প্রথম পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হতে চলেছে। প্রাথমিক ধাপে ‘ইয়ারেন্ডিল-১’ নামের একটি বিশেষ স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানো হবে। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কৃত্রিম রোদ ফেলার প্রস্তুতি চলছে।
রিফ্লেক্ট অরবিটালের দাবি, এই প্রযুক্তির সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বিভিন্ন ক্ষেত্রে:
সৌরবিদ্যুতের বিপ্লব: সূর্য ডুবে যাওয়ার পরেও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সচল রাখা সম্ভব হবে, যা শক্তির সংকট মেটাতে এক বিশাল ভূমিকা নিতে পারে।
বিপর্যয় মোকাবিলা ও উদ্ধারকাজ: প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে কোনো এলাকা অন্ধকারে ডুবে গেলে সেখানে দ্রুত কৃত্রিম আলো পৌঁছে দিয়ে উদ্ধারকাজ ত্বরান্বিত করা যাবে।
গ্রাহকের মর্জি অনুযায়ী আলো: বিশেষ মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দের এলাকায় আলো পৌঁছে দেওয়ার আবেদন করতে পারবেন, এবং সেই অনুযায়ী আয়নার দিক পরিবর্তন করা হবে।
২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশে প্রায় ৫০ হাজার স্যাটেলাইট পাঠানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে এই সংস্থা। তাদের দাবি, এই স্যাটেলাইটগুলোর মিলিত প্রতিফলিত আলো চাঁদের আলোর সমতুল্য উজ্জ্বলতা তৈরি করতে পারবে।
তবে এই বর্ণাঢ্য পরিকল্পনার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ও পরিবেশগত ঝুঁকি। গবেষণায় দেখা গেছে, মহাকাশ থেকে প্রতিফলিত আলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে নিচে নামে, তখন বায়ুমণ্ডলের অণু ও অ্যারোসলের কারণে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে আলো পুনরায় ওপরে প্রতিফলিত হয়ে এক জটিল বিক্ষেপণ তৈরি করতে পারে।
এর ফলে, আপনি যে নির্দিষ্ট এলাকায় আলো চাইছেন, তার বাইরেও বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে একটি কৃত্রিম আলোর আভা বা আচ্ছন্নতা তৈরি হতে পারে।
এমন যুগান্তকারী আইডিয়া প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসেছেন বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এবং পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা। তাদের প্রধান উদ্বেগগুলো হলো:
রাতের স্বাভাবিক অন্ধকার নষ্ট: কৃত্রিম আলোর দাপটে রাতের আকাশের স্বাভাবিক অন্ধকার চিরতরে হারিয়ে যাবে, যা নিশাচর প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনচক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
নক্ষত্র পর্যবেক্ষণে বাধা: জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের গবেষণা এবং মহাকাশ পর্যবেক্ষণের কাজে এই অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো গভীর বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে।
গত জুলাই মাসে মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে অনুমোদন পেলেও, এই প্রকল্পের নৈতিকতা ও পরিবেশগত দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যাচ্ছে। মানুষের বিলাসবহুল সুবিধার জন্য প্রকৃতির সবচেয়ে প্রাচীন নিয়মে হস্তক্ষেপ করা কি আদতে বুদ্ধিমানের কাজ হবে? নাকি এর চড়া মূল্য চুকাতে হবে পুরো পৃথিবীকে? এই জটিল প্রশ্নের উত্তর সময়ই বলে দেবে।
সান নিউজ / রাজীব