ইরানের সাবেক নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ১৯৫৩ সালে উৎখাতের পর প্রায় সাত দশক পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনের নানা প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িয়েছে। কিন্তু এসব হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের জন্য কতটা সফলতা বয়ে এনেছে—এ প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর তেহরানের পাল্টা জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। লেবানন, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। তবে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক কাঠামো আরও কঠোর অবস্থান নিলে সেই কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯৫৩ সালে। ওই বছর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও যুক্তরাজ্যের যৌথ অভিযানে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে আবার ক্ষমতায় বসানো হয়। ইরানের তেল সম্পদের ওপর পশ্চিমা প্রভাব বজায় রাখাই ওই হস্তক্ষেপের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
তবে শাহের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষ শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পথ তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান ইরানি জনগণের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবকে আরও গভীর করে। বর্তমান ইরানি শাসনব্যবস্থাও নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠায় ওই ঘটনার স্মৃতি ব্যবহার করে থাকে।
শুধু ইরান নয়, মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও মার্কিন হস্তক্ষেপের ফল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০০৩ সালে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগে ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়ে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্র। পরে দেশটিতে ওই অস্ত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে বিপুল প্রাণহানি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটে।
২০১১ সালে লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পরও দেশটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশটি বিভক্ত রয়েছে।
আফগানিস্তানেও দুই দশক ধরে বিপুল অর্থ ও সামরিক শক্তি ব্যয়ের পর ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় দ্রুত তালেবান দেশটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে। ফলে দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির পরও ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছিল, তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
শীতল যুদ্ধের সময় লাতিন আমেরিকাতেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট জাকোবো আরবেনজকে ক্ষমতাচ্যুত করা, কিউবার ১৯৬১ সালের বে অব পিগস অভিযান এবং ১৯৭৩ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে উৎখাতের পর সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার ঘটনাগুলো এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, গত সাত দশকের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—সামরিক শক্তি ব্যবহার করে কোনো দেশের সরকারকে উৎখাত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ এবং নতুন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কঠিন।
মার্কিন নীতি বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের এসব পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। ফলে বিদেশে সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যেও ক্রমবর্ধমান প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সান নিউজ/ জামান