দিল্লিতে আয়োজিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্ব রাজনীতির চলমান গতিপ্রকৃতি নিয়ে এক নতুন ও গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তার মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছায় নিজেদের ধীরে ধীরে গুটিয়ে বা একা করে নিচ্ছে। আর ঠিক এই সুযোগেই বিশ্বজুড়ে নাটকীয়ভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে চীন। পরাশক্তি এই দুই দেশের তীব্র দ্বৈরথের কারণে বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনীতির সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ বদলে যাচ্ছে।
রাজধানী দিল্লিতে বসা ৬২তম মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে অংশ নেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রায় ৮০ জন বিশিষ্ট নীতিনির্ধারক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ। প্রতি বছর এই আসরে বিশ্ব নিরাপত্তার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হলেও এবার জয়শঙ্করের বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে দারুণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জয়শঙ্করের দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের চালিকাশক্তি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার এই দীর্ঘমেয়াদি ও তীব্র প্রতিযোগিতা।
আমেরিকার বর্তমান ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জয়শঙ্কর বলেন, আমেরিকা নিজের ইচ্ছাতেই আজ নিজেদের আন্তর্জাতিক অবস্থান থেকে কিছুটা সরিয়ে নিচ্ছে এবং একধরনের নিঃসঙ্গ শক্তির রূপ ধারণ করছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক দিক থেকে চীন বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। বর্তমানে গোটা বিশ্বে যা উৎপাদিত হয়, তার প্রায় এক তৃতীয়াংশই আসছে চীন থেকে। এই বিশাল অর্থনৈতিক শক্তির জোরেই বেইজিং এখন রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়িয়ে চলেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা, আমেরিকা ও চীনের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল ওই দুই দেশের সীমানার ভেতরেই আটকে নেই, বরং এর ঢেউ আছড়ে পড়ছে গোটা বিশ্বে।
তবে এই দুই পরাশক্তির রেষারেষির মাঝে এক নতুন আশার আলো দেখছেন ভারতীয় এই মন্ত্রী। তার মতে, বড় দুই দেশের এই টানাটানির সুযোগ নিয়ে এখন নিজেদের জায়গা শক্ত করার চেষ্টা করছে মাঝারি ও উদীয়মান শক্তির দেশগুলো। কোনো এক পক্ষের লেজুড়বৃত্তি না করে এসব দেশ এখন নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর পথ বেছে নিচ্ছে। নিজেদের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে তারা যেমন স্বনির্ভর হয়ে উঠছে, তেমনি একে অপরের সঙ্গে ‘এজেন্ডাভিত্তিক’ বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে একে অন্যকে সহযোগিতা করছে।
এই প্রসঙ্গের টানেই উঠে এসেছে ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক জোটের কথা। জয়শঙ্কর মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের জোরালো কণ্ঠস্বর বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার জন্যই আজ একমঞ্চে জড়ো হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, এই উদীয়মান দেশগুলো একদিকে যেমন চীন বা আমেরিকার মতো পরাশক্তির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে নিজেদের স্বার্থে একে অপরের পাশেও দাঁড়াতে দ্বিধা করছে না। বর্তমান বিশ্বের এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক রূপান্তরই আগামীদিনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সান নিউজ / রাজীব