ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পাল্টে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক মহলে এখন চরম আলোচনা চলছে। বিশেষ করে মলদোভায় সম্প্রতি বিধ্বস্ত হওয়া রাশিয়ার সর্বাধুনিক ‘গেরান’ সিরিজের একটি জেটচালিত কামিকাজে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ হাতে পাওয়ার পর পশ্চিমা গোয়েন্দা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক হইচই। এই ড্রোনটির প্রযুক্তিগত গোপনীয়তা ভেদ করে কীভাবে তা প্রতিহত করা যায়, সেই পথ খুঁজছে বিশেষজ্ঞ মহল।
ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গত মে মাসে প্রতি মাসে যেখানে প্রায় ৫০০টি গেরান-৪ এবং উন্নত গেরান-৫ টার্বোজেট ড্রোন তৈরি হতো, বর্তমানে তা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে মাসে প্রায় ৩ হাজারে ঠেকেছে। দ্য ন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, গত ৩০ সেপ্টেম্বর মলদোভায় আছড়ে পড়া ওই ড্রোনটির ধ্বংসাবশেষ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। ঘণ্টায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা এই মারণাস্ত্রটির ফ্লাইট কম্পিউটার, নেভিগেশন সিস্টেম, শক্তিশালী ইঞ্জিন এবং ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে এর গতিপথ রোধের উপায় খোঁজা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাশিয়া যেভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত অস্ত্র প্রযুক্তির নকশা বদলে ফেলছে, তাতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ডার ভলদিমির সেরদিউক জানিয়েছেন, এই ড্রোনগুলোর অবিশ্বাস্য গতির কারণে সেগুলোকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু হিসেবে শনাক্ত করে প্রতিহত করার সময় পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যেখানে ধীরগতির ড্রোন ভূপাতিত করা সহজ ছিল, সেখানে নতুন মডেলগুলোর কারণে সাফল্যের হার নেমে এসেছে প্রায় ৬০ শতাংশে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউক্রেনও মরিয়া হয়ে জেটচালিত ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিহতকারী ড্রোন তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ ইউক্রেনের বর্তমান ইন্টারসেপ্টরগুলোর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি হওয়ায় এই নতুন রুশ ড্রোনগুলোকে তাড়া করে ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাছাড়া, কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মাত্র ১ লাখ ডলার দামের এসব ড্রোন ধ্বংস করা অর্থনৈতিকভাবেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এই জেটচালিত ড্রোনগুলোর পাল্লা প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার হওয়ায় উৎক্ষেপণের পর এগুলোকে তুলনামূলক কাছাকাছি এলাকা থেকেই অপারেট করতে হয়, যা ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণের সুযোগ তৈরি করে।
অন্যদিকে, এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ শুধু ইউক্রেন যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রবার্ট টোলাস্ট সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়ার এই জেট প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা খুব দ্রুতই ইরানের মতো দেশের হাতে পৌঁছানো কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ইরানের হাতে ইতিমধ্যে শাহেদ-২৩৮ এর মতো টার্বোজেট ড্রোন রয়েছে। রুশ প্রযুক্তির সঙ্গে হাত মেলালে ইরান কিংবা ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা যদি এমন সাশ্রয়ী ও দ্রুতগতির জেট ড্রোন তৈরি করে ফেলে, তবে তা সৌদি আরবসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য মারাত্মক এক নিরাপত্তা সংকট তৈরি করতে পারে।
আকাশ যুদ্ধের এই নতুন প্রতিযোগিতায় একদিকে যেমন অস্ত্রের গতি ও মারকাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে, অন্যদিকে কম খরচে ও স্বল্প সময়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমরবিদদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সান নিউজ/রাজীব