ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি এলাকার সম্ভ্রান্ত এক পরিবারে জন্ম নেওয়া গৃহবধূ ফারিয়া আক্তার ইলা। মাত্র তিন বছর আগে শখের বসে একটি গরু পালন দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। সময়ের পরিক্রমায় সেই ছোট উদ্যোগই আজ রূপ নিয়েছে বড় এক সফল খামারে। বর্তমানে তার খামারে রয়েছে ৬৪টি গরু। এর মধ্যে ১ হাজার কেজি ওজনের গরু‘ডেনাল ট্রাম্প’ মাতাচ্ছেন পুরো এলাকা। দুর দুরন্ত থেকে ডোনাল্ট ট্রাম্প’কে শখের বসে দেখতে আসেন। শুধু গরুর খামারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ইলা। গরুর ব্যবসায় সফল হওয়ায় পাশাপাশি ছাগল পালন, কবুতর পালন ও মাছ চাষও করছেন।
আত্মীয়-স্বজনের অনীহা ও নানা সমালোচনার মধ্য দিয়েই তাকে পথচলা শুরু করতে হয়েছিল নারী উদ্দ্যেক্তা ফারিয়া আক্তার ইলাকে। তবে প্রবাসী স্বামীর সহযোগিতা ও মানসিক সমর্থন তাকে এ পর্যন্ত এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে বলে জানান তিনি। নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও সাহসকে পুঁজি করে আজ তিনি জেলার অন্যতম সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এ খামারে সব’চে বেশী আলোচনায় আছে হাজার কেজি ওজনের ‘ডোনাল্ট ট্রাম্প’। রাজাপুর উপজেলার মধ্যে সব’চে বড় গরু বলে দাবী করছেন খামারী ইলা।
নিজের বাবার বাড়িতে একটি গরু দিয়ে শুরু হওয়া খামারটিতে এখন রয়েছে ফাইটার, শাহিওয়াল ও ওয়েস্টার্ন ফ্রিজিয়ানসহ বিভিন্ন জাতের ৬৪টি গরু। গরুর পাশাপাশি তিনি বাণিজ্যিকভাবে হাঁস, মুরগি ও কবুতরও পালন করছেন। কোনো ধরনের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত খাবার নয়, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে খড়, ঘাস ও দানাদার খাবার দিয়ে পশু লালন-পালন করছেন তিনি।
সরেজমিনে রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি এলাকায় অবস্থিত “ফাহিয়ান এগ্রো ফার্ম”-এ গিয়ে দেখা যায়, নিজ হাতে গরুর পরিচর্যা করছেন ইলা। খামারের পরিচালক ফারিয়া আক্তার ইলা জানান, ২০২৩ সালে পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে শখের বসে একটি গরু পালন শুরু করেন তিনি। শুরুতে অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। বরং একজন নারী হয়ে খামার পরিচালনা করায় নানা কটুক্তি ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু তিনি থেমে যাননি।
তিনি বলেন, শুরু থেকেই তার প্রবাসী স্বামী মো. সুমন খান তাকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। পরবর্তীতে পরিবারের সহযোগিতায় গড়ে ওঠে “ফাহিয়ান এগ্রো ফার্ম”। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এই খামার দেখতে আসেন। প্রতিদিনই খামারে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। খামার থেকে বছরজুড়ে জীবন্ত গরু কেজি হিসেবে বিক্রি করা হয়।
আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এখন খামারে চলছে ব্যাপক ব্যস্ততা। স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩০টি গরু বিক্রি হয়েছে বলে জানান ইলা। এবারের কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রায় এক কোটি টাকার গরু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন তারা। এ খামারে সব’চে বেশী আলোচনায় থাকা হাজার কেজি ওজনের ‘ডোনাল্ট ট্রাম্প’কে কিনতে প্রতিদিনই কেউ না কেউ ভিড় করছেন। কেউ বা আবার এক নজর দেখার জন্য আসছে, তুলছেন ছবি। আ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প’র রামে নাম করা এই গরুটি দেখতে নাকি তারই মত। খুবই রাগী স্বভাবের এই গরুটি সামলাতে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানানা খামারিকে। ডোনাল্ট ট্রাম্পই রাজাপুর উপজেলার মধ্যে সব’চে বড় গরু বলে দাবী করছেন খামারী ফারিয়া আক্তার ইলা।
তার এ খামারে তিনি ছাগল পালন, কবুতর পালন ও মাছ চাষও করছেন। তার এই উদ্যোগে স্থানীয় কয়েকটি পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
খামারে কর্মরত শ্রমিকরা জানান, এখানে গরুগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে লালন-পালন করা হয়। খামারে কাজ করে তারা নিয়মিত আয় করছেন এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন।
ফাহিয়ান এগ্রো ফার্মের পরিচালক ফারিয়া আক্তার ইলা বলেন, “শুরুতে অনেক মানুষ আমাকে নিরুৎসাহিত করেছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস হারাইনি। আমার স্বপ্ন ছিল বড় একটি খামার গড়ে তোলা। এক সময় যারা সমালোচনা করতেন, তারাই এখন আমার কাজের প্রশংসা করেন। এটা আমাকে আরও অনুপ্রাণিত করে।” তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে খামার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
রাজাপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, “ফারিয়া আক্তার ইলা একজন পরিশ্রমী নারী উদ্যোক্তা। দেশীয় পদ্ধতিতে গরু লালন-পালন করে তিনি সফল হয়েছেন। তাকে দেখে অনেক নারী এই কাজে আগ্রহী হচ্ছেন। প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে তাকে নিয়মিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”
স্বপ্ন, সাহস আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে যে সফলতা অর্জন সম্ভব তারই অনন্য উদাহরণ ফারিয়া আক্তার ইলা। একটি গরু দিয়ে শুরু হওয়া সেই যাত্রা এখন অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার জন্য।
সান নিউজ/আরএ