সারাদেশ

ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদে বালু উত্তোলনে হুমকির মুখে উন্নয়ন প্রকল্প

এস,এম শাহাদৎ হোসইন, গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি:

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট এলাকায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে অবাধে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিদিন নদী থেকে উত্তোলন করা বালু নৌকায় করে তীরে এনে স্তুপ করা হচ্ছে। সেই সব বালু পরে ৪০ থেকে ৫০টি ট্রাক্টর ও ট্রাকে করে গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রির জন্য পাঠানো হচ্ছে। এতে বালাসীঘাটের নদী তীর রক্ষা প্রকল্প, ফেরিঘাট টার্মিনালসহ প্রায় ৪০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, নদী তীরবর্তী বসতি ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

বালাসীঘাট এলাকায় দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিক দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলন বালু নৌকায় করে নদীর তীরে এনে রাখা হচ্ছে। পরে সেখান থেকে ট্রাক্টর ও ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

এলাকাবাসী বলেন, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে বালাসীঘাটে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করে আসছে। তাদের অভিযোগ, প্রশাসন ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ম্যানেজ করেই চলছে বালুর ব্যবসা। এমনকি গাইবান্ধা-বালাসী সড়কের বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়ার মাধ্যমে বালু পরিবহন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বালাসীঘাটে বালু উত্তোলনের ফলে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে নদীতীর রক্ষা ও নদী বন্দর কেন্দ্রীক উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে।

স্থানীয়দের দাবি, বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ ও গতিপথে পরিবর্তন ঘটলে নদীতীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে ভাঙন তীব্র হতে পারে। এতে বালাসী ফেরিঘাট টার্মিনালসহ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নদী তীরবর্তী ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, বালু উত্তোলনের স্থান ও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

বালাসীঘাটের বালু উত্তোলন নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো এই অঞ্চলের সম্ভাবনাময় খনিজ সম্পদ । সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা সদর ও ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্র-যমুনার চর এলাকায় খনিজ বালু উত্তোলনের জন্য এভারলাস্ট মিনারেলস লিমিটেডকে তিনটি ব্লকে মোট ২ হাজার ৩৯৫ হেক্টর এলাকার খনি ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বালাসি ব্লকে রয়েছে ৭৯৯ হেক্টর এলাকা। ইজারার মেয়াদ ২০ জুন ২০২৪ থেকে ১৯ জুন ২০৩৪ পর্যন্ত।

এভারলাস্টের তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা মিনারেল স্যান্ডস প্রকল্পের আওতায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বালুচরে থাকা ভারী খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব খনিজের মধ্যে রয়েছে জিরকন, রুটাইল, ইলমেনাইট, গারনেট ও ম্যাগনেটাইট। সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ধারিত খনি এলাকার বাইরে বা অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে মূল্যবান খনিজসমৃদ্ধ বালুর স্তুর স্থানচ্যুত বা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সরকারের পরিকল্পিত খনিজ সম্পদ আহরণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় রাজস্বের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বালাসীঘাটে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ নতুন নয়। বালাসীঘাটের ব্লকের নিচ থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে স্থানীয়রা বিভিন্ন সময় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেছিল, নদী ভাঙন প্রবণ এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বালাসীঘাট এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ঘটনায় কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযান পরিচালনার পরও বিভিন্ন সময়ে নতুন করে বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে। নদী থেকে বালু উত্তোলনের পাশাপাশি তা পরিবহনে ব্যবহৃত বিপুলসংখ্যক ট্রাক্টর ও ট্রাকের কারণে গাইবান্ধা-বালাসী সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচলের ফলে সড়কের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে এবং সড়কের পাশে বসবাসকারী মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে।

বাংলাদেশের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী নদীভাঙনের আশঙ্কা সৃষ্টি করে, নদীর তীর বা তীরসংলগ্ন ফসলি জমি ও পরিবেশের ক্ষতি করে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঝুঁকিতে ফেলে এমনভাবে বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ। আইন অনুযায়ী সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন স্থান থেকেও বালু উত্তোলনের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বালু ব্যবসায়ী বলেন, তার নাম ভাঙিয়ে অনেকেই বালু উত্তোলন করছেন। ব্রহ্মপুত্র নদে বিলীন হয়ে যাওয়া নদী সিকস্তি জমিতে চর জেগে ওঠায় সেখান থেকে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছি। তিনি একা নন, সবাইকে ম্যানেজ করেই বালু উত্তোলন করেন। তবে তার এ বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান সান নিউজকে বলেন, বালু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বালাসীঘাটে নিয়মিত নজরদারি ও সমন্বিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। কোন এলাকায় খনিজ সম্পদ আহরণের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে, কোথায় বালু উত্তোলন বৈধ এবং কোন কোন এলাকায় বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা জরুরি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে একদিকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, ফেরিঘাট টার্মিনাল,সড়ক ও নদীতীরবর্তী জনপদ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে দেশের সম্ভাবনাময় মূল্যবান খনিজ স¤পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বালাসীঘাটের নদী, পরিবেশ, সরকারি অবকাঠামো ও খনিজ স¤পদ রক্ষায় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ খনিজ স¤পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

সান নিউজ/আরএ

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

মুন্সীগঞ্জ সদরে ৫০০ ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

মুন্সীগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ মো. দেল...

১৯২৭ -২০২৭: গৌরীপুর পৌরসভা

ব্রিটিশ আমলে ১৯২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ময...

মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য আসছে ‘১০০-তে ১০০’ কর্মসূচি

আগামীকাল থেকে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে ‘১০০-তে ১০০’ কর...

মাটিরাঙায় বিনামূল্যে স্তন ও জরায়ুর মুখ ক্যানসারের পরীক্ষা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত 

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় অসহায় নিম্মবিত্ত মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দি...

মাটিরাঙায় বিনামূল্যে স্তন ও জরায়ুর মুখ ক্যানসারের পরীক্ষা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত 

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় অসহায় নিম্মবিত্ত মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দি...

মুন্সীগঞ্জ সদরে ৫০০ ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

মুন্সীগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ মো. দেল...

মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য আসছে ‘১০০-তে ১০০’ কর্মসূচি

আগামীকাল থেকে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে ‘১০০-তে ১০০’ কর...

১৯২৭ -২০২৭: গৌরীপুর পৌরসভা

ব্রিটিশ আমলে ১৯২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ময...

ভালুকায় দেশীয় মাছ রক্ষায় বিশেষ অভিযান: বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ ও ধ্বংস

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নে দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় পরিচালিত...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা