আবুধাবির শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর চলা একমাত্র টেস্ট শেষ হয়েছে ড্রয়ে। ৪৭৯ রানের পাহাড়সমান লক্ষ্য সামনে নিয়ে আফগানিস্তান শেষ দিনে ব্যাট হাতে মরণপণ লড়াই করেছে। দিন শেষে তাদের স্কোর ৮ উইকেটে ৩৪৬, জয় থেকে ১৩৩ রান দূরে। বাংলাদেশ পাঁচ দিনের বেশিরভাগ সময় এগিয়ে থেকেও শেষ দুটি উইকেট তুলে নিতে পারেনি।
তানজিদের ঝড়, তারপর হঠাৎ ধস : টস জিতে ব্যাটিং বেছে নেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম টেস্ট, যা খেলা হচ্ছে কোনো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে। ডারউইনে সদ্য সেঞ্চুরি করা তানজিদ হাসান শুরু থেকেই চড়াও হন আফগান বোলারদের ওপর।
৭১ বলে ৮ চার ও ৪ ছক্কায় তার ৮৩ রানের ইনিংসে লাঞ্চের আগেই বাংলাদেশ পৌঁছে যায় ১ উইকেটে ১৩৪ রানে। টেস্টের প্রথম সেশনে সেঞ্চুরির হাতছানি ছিল, কিন্তু ইসমত আলমের বলে ইকরাম আলীখিলের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনি। শাদমান ইসলামের সঙ্গে ওপেনিং জুটি থামে ১২৪ রানে।
এরপর যা ঘটল, তা বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্ন। ২২১ রানে ২ উইকেট থেকে মাত্র ৪ রানের ব্যবধানে তিন উইকেট হারিয়ে দল নেমে গেল ২২৫ রানে ৫ উইকেটে। মুশফিকুর রহিম ফিরলেন শূন্য হাতে, আফগান পেসারদের শর্ট বলের কাছে বারবার কুপোকাত হলো টপ অর্ডার।
লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ ৬২ রানের জুটিতে সামাল দিলেন। প্রথম দিন শেষে স্কোর ৮ উইকেটে ৩১৭। দ্বিতীয় সকালে নাঈম হাসানের অপরাজিত ৩৫ রানে বাংলাদেশ থামল ৩৪৬ রানে। মোহাম্মদ সালিম ৪টি ও ইয়ামিন আহমদজাই ৩টি উইকেট নেন।
রহমত শাহর একার লড়াই : আফগানিস্তানের জবাব শুরু হয় সতর্কভাবে। আবদুল মালিক খেলেন ৬২ রানের ইনিংস, যা তার টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম হাফসেঞ্চুরি। দ্বিতীয় দিন শেষে স্কোর ৪ উইকেটে ২১১। অধিনায়ক রহমত শাহ অপরাজিত ছিলেন ৮৪ রানে, ইকরাম আলীখিলকে সঙ্গে নিয়ে গড়েছিলেন ৭২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি।
হাসান মাহমুদের ইতিহাস : তৃতীয় দিনের সকালটা পুরোপুরি বাংলাদেশের নামে লেখা হয়ে গেল। হাসান মাহমুদ টানা তিন বলে তুলে নিলেন ইসমত আলম, কায়েস আহমদ ও জিয়াউর রহমানকে। বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে টেস্টে হ্যাটট্রিক করলেন তিনি।
এর আগে এই কীর্তি ছিল শুধু আলোক কাপালি (২০০৩) ও সোহাগ গাজীর (২০১৩)। পাঁচ উইকেটের এই স্পেলে ৫৫ রান দিয়ে তিনি ৫টি উইকেট নেন, আর টেস্টে ৫০ উইকেটের মাইলফলকও ছুঁয়ে ফেলেন। এবাদত হোসেন নেন ৫৬ রানে ৪ উইকেট। রহমত শাহ অপরাজিত থাকলেন ১০৫ রানে। চার ছক্কা ও চারের এই ইনিংস তাঁর চতুর্থ টেস্ট সেঞ্চুরি, কিন্তু অন্য প্রান্তে সঙ্গ পাননি। আফগানিস্তান অলআউট ২৪০ রানে, বাংলাদেশের লিড ১০৬।
লিটনের শতক, শান্তর সাহসী ঘোষণা : দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৩ রানে ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর মুশফিকুর রহিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত দলকে টেনে তোলেন। তৃতীয় দিন শেষে বাংলাদেশ ছিল ৬ উইকেটে ২২৩ রানে, লিড ৩২৯। চতুর্থ দিনে ব্যাট হাতে মঞ্চ কাঁপালেন লিটন দাস।
১০২ রানের ইনিংসে তিনি পেলেন নিজের সপ্তম টেস্ট সেঞ্চুরি। মেহেদী হাসান মিরাজ করলেন ৫২। ১০৫.২ ওভারে ৭ উইকেটে ৩৭২ রানে ইনিংস ঘোষণা করে শান্ত আফগানদের সামনে রাখলেন ৪৭৯ রানের লক্ষ্য। উইকেটের পেছনে লিটনও গড়লেন নতুন রেকর্ড। ম্যাচে তাঁর আটটি ডিসমিসাল বাংলাদেশের কোনো উইকেটরক্ষকের টেস্ট ম্যাচে সর্বোচ্চ।
শেষ দিনের দেয়াল : চতুর্থ দিন শেষে আফগানিস্তান ৩ উইকেটে ১৩২। এবাদত ও হাসান ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ধারাবাহিকভাবে, জয়ের জন্য দরকার ছিল সাত উইকেট। কিন্তু পঞ্চম দিনে আফগান ব্যাটাররা ব্যাট হাতে নিলেন দেয়ালের ভূমিকা। সেদিকুল্লাহ আতাল ক্রিজে গেঁথে থাকলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা, হাশমতউল্লাহ শহিদি দিলেন সঙ্গ। মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামের স্পিন, আর হাসান ও এবাদতের গতি, কোনোটাই শেষ ধাক্কাটা দিতে পারল না। কায়েস আহমদ ৭৪ বলে ৩৭ রানে এক ছক্কা ও ছয় চারে সময় কাটালেন। শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তান থামল ৮ উইকেটে ৩৪৬ রানে।
পরিসংখ্যানের আয়নায় ম্যাচ : এই টেস্টে দুই দল মিলে করেছে ১৩০৪ রান, যা বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের মধ্যকার টেস্টে সর্বোচ্চ ম্যাচ অ্যাগ্রিগেট। দুই দলের টেস্ট মুখোমুখি লড়াইয়ে ১ জয় করে সমতা ছিল, আর আবুধাবির ড্রয়ের পরও সেই সমতাই বহাল। আফগানিস্তানের জন্য এটি ছিল চলতি তিন বছর চক্রের ষষ্ঠ টেস্ট। র্যাংকিংয়ে ঢুকতে আরও দুটি টেস্ট খেলতে হবে তাদের।
বাংলাদেশের জন্য আফসোসটা তাই গভীর। ব্যাটিংয়ে ধস, বোলিংয়ে ইতিহাস, লিটনের শতক, সবই ছিল। শুধু ছিল না জয়ের শেষ পাওনাটুকু।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৩৪৬ ও ৩৭২/৭ ডি. আফগানিস্তান: ২৪০ ও ১৪২ ওভারে ৩৪৬/৮ (আতাল ১১১, রহমত ৫১, কায়েস ৪৯*, শহীদি ৩৬, আলীখিল ৩৩; ইবাদত ৩/৫০, মিরাজ ৩/৭৩, হাসান ১/৬৬, তাইজুল ১/১১২)। ফল: ড্র
সান নিউজ / রাজীব