ছবি: এআই।
বাণিজ্য
শেষ পর্ব

ব্যাংক একীভূতকরণ: বিশ্বে সফল, বাংলাদেশে কী হবে?

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এক নজিরবিহীন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় বিপর্যস্ত পাঁচটি ইসলামী ধারার বেসরকারি ব্যাংককে একীভূত করে গঠন করা হচ্ছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। সরকারের লক্ষ্য আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুরু হবে এখনই।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, নতুন নাম বা নতুন কাঠামো তৈরি করলেই সংকট দূর হবে না। দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকটির সফলতা নির্ভর করবে খেলাপি ঋণ আদায়, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর।

বিশ্বের অভিজ্ঞতা কী বলছে?

আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ব্যাংক একীভূতকরণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহুবার প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে প্রায় প্রতিটি সফল উদাহরণেই একীভূতকরণের পাশাপাশি কঠোর আর্থিক সংস্কার, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

মালয়েশিয়ার মডেল

১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর মালয়েশিয়া দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে সীমিত সংখ্যক শক্তিশালী ব্যাংক গড়ে তোলে। একই সঙ্গে গঠন করা হয় পৃথক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি), যা খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে কঠোর তদারকি এবং দ্রুত সংস্কারই দেশটির সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল।

সিঙ্গাপুরের ভিন্ন কৌশল

সিঙ্গাপুরে ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্দেশ্য ছিল সংকট মোকাবিলা নয়; বরং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। সেখানে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মধ্যে একীভূতকরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো হয়েছিল।

থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা

থাইল্যান্ড আর্থিক সংকটের পর কর-সুবিধা, আইনি সহায়তা, নীতিগত সংস্কার এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ব্যাংক পুনর্গঠনের পথে এগোয়। এতে ধীরে ধীরে ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা কেন আলাদা?

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলোর তুলনায় অনেক বেশি জটিল। এখানে শুধু খেলাপি ঋণ নয়, অর্থ পাচার, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতাও বড় সমস্যা।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর রিয়াজ বলেন, বছরের পর বছর অনিয়মের কারণে পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি প্রায় ভেঙে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি এবং মূলধন প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

তার মতে, শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া মানেই সফলতা নিশ্চিত নয়। অতীতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালনাতেও নানা দুর্বলতা দেখা গেছে। ফলে নতুন ব্যাংকেও যদি রাজনৈতিক প্রভাব বা সুশাসনের ঘাটতি থেকে যায়, তাহলে সরকারের আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে।

সরকারের সামনে চারটি বড় চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ব্যাংক গঠনই শেষ লক্ষ্য নয়। বরং সামনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

প্রথমত, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার। বিশেষ করে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা হবে দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া।

দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতের মূলধন জোগান নিশ্চিত করা। প্রাথমিক সহায়তা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজন হতে পারে।

তৃতীয়ত, পাঁচটি পৃথক ব্যাংকের প্রযুক্তি, গ্রাহক তথ্যভাণ্ডার, হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থা ও কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা।

চতুর্থত, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা

একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, পুনর্গঠনের সময় গণছাঁটাই না করে অভিজ্ঞ জনবলকে কাজে লাগানো উচিত।

তাদের প্রত্যাশা, পূর্ববর্তী মালিকদের অনিয়মের দায় যেন মাঠপর্যায়ের নিরীহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর না পড়ে এবং তারা যেন আইনি হয়রানির শিকার না হন।

যে তিনটি পদক্ষেপ ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়

ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, নতুন ব্যাংকের সফলতার জন্য তিনটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—

অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধার।
আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা।
সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও স্বাধীন পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

তাদের মতে, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা সময় বাড়িয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই হবে।

একটি ব্যাংক নয়, সংস্কার প্রয়োজন পুরো খাতেই

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাঁচটি ব্যাংকের একীভূতকরণ আসলে দেশের ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন।

তাদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংককে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি বড় ঋণ অনুমোদনে কঠোর নজরদারি, পরিচালকদের জবাবদিহি, করপোরেট সুশাসন এবং ঋণসংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, নতুন ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, দেশে এটি হবে সরকারি মালিকানাধীন একমাত্র শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। দক্ষ ব্যবস্থাপনা, অভিজ্ঞ পরিচালনা পর্ষদ এবং সুশাসনের মাধ্যমে নতুন প্রতিষ্ঠানকে একটি শক্তিশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

সামনের পথ কতটা কঠিন?

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে একসঙ্গে পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করার ঘটনা এই প্রথম। ফলে এটি যেমন একটি সাহসী সিদ্ধান্ত, তেমনি বড় ঝুঁকিও বহন করছে।

যদি খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার, তারল্য সংকট নিরসন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়, তাহলে এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, সংস্কার কার্যক্রম ব্যর্থ হলে নতুন ব্যাংকও পুরোনো সমস্যার ভারে জর্জরিত হয়ে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও করদাতাদের ওপরই বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ কেবল একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষার ফল নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক খাত কতটা স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

সান নিউজ/ জামান

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

পদবঞ্চনার অভিযোগে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন

দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করেও সাংগঠনিক পদ-পদবী থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে র...

বোয়ালমারীতে  মহিলা কলেজের গভার্নিং বডির সভাপতি হলেন ইউএনও 

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের পুনর্গঠিত অ্যাডহক...

মোংলায় গাঁজাসহ ব্যবসায়ী আটক, ১ বছরের জেল ও অর্থদন্ড 

মোংলায় মাদকবিরোধী অভিযানে ৭শ ৮০ গ্রাম গাঁজাসহ ওমর ফারুক খাঁন (৩৫) নামে এক যু...

ইন্ডিয়ানায় প্রবাসী বাঙালির উৎসব

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের নোবলসভিল দুই দিনের জন্য যেন রূপ নিয়েছি...

চা শিল্পের উন্নয়নে সরকারের সহযোগিতা: প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের চা শিল্পের বিকাশ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের বিভিন্ন সমস...

সব সমুদ্রবন্দরে সতর্কতা জারি

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি নিম্নচাপ উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের কাছে ভারতের পশ্চি...

আবারও আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ‘ককরোচ পার্টির’

ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ র টানা ৩৭ দিনের আন্দোলন থেমেছে মাত্র গতকাল।...

‘পথের পাঁচালী’ দেখে মুগ্ধ নোলান

হলিউডের অস্কারজয়ী নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান ভারতীয় চলচ্চিত্র অপু ট্রিলজি&rsq...

উলিপুরে পরিবেশ-দুর্যোগ সচেতনতায় কর্মসূচি

কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, পলিথিনের ব্যবহার কমানো...

‘ইত্যাদি’তে পুতুলের স্বপ্নজয়ের গল্প

‘ক্লোজআপ ওয়ান তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতা দিয়ে দ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা