প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স নগর-রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে পেরিক্লিস অনন্য অবদান রেখেছিলেন। মার্জিত ব্যক্তিত্ব, শৈল্পিক মানসিকতা, দৃঢ় সংকল্প, দূরদর্শী চিন্তা, প্রজ্ঞানিষ্ঠ বিচক্ষণতা, বাগ্নিতা ইত্যাদি গুণাবলীর কারণে তৎকালীন এথেনীয় রাজনীতিতে এক অবিসংবাদিত গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে তিনি প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। তার ব্যক্তিত্বের মাধুর্য, বিশেষ করে কথা বলার শৈল্পিকতা সহজেই সবাইকে মুগ্ধ করতো। কাউকে বুঝিয়ে বা পটিয়ে নিজ মতে নিয়ে আসার অসাধারণ কলা-বিদ্যা তার আয়ত্তে ছিল। এই কলা কৌশলের মাত্রা এতটাই ছিল যে বৃহত্তর কোন স্বার্থে নিজের প্রথম স্ত্রীকে কৌশলে বুঝিয়ে শুনিয়ে অন্যের কাছে বিবাহ দিয়ে নিজে ভিন্ন এক নারীকে ঘরে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরিবার-পরিজন, জনসাধারণ কেউই এ ব্যাপারে কোন অসন্তোষ প্রকাশ করেনি। তবে এতসব করে তিনি অন্য এক নারীকে ঘরে এনেছিলেন একান্তই নিজের স্বার্থে তা বলা চলে না। পেরিক্লিসের নেতৃত্ব এবং নবগঠিত গণতান্ত্রিক নগর রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণও এর সাথে সংযুক্ত ছিলো। কেননা এই নারী কোনো সাধারণ নারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন অসাধারণ বিদুষী, বিচক্ষণ কূটনীতিবিদ, সর্বোপরি বাক-কলায় পারদর্শী অসাধারণ বক্তৃতা লেখক। কেবল বৈষয়িক বা প্রায়োগিক বুদ্ধি নয়, বিমূর্ত দার্শনিক জ্ঞান ও যেকোনো যুক্তিযুক্ত তাত্তি¡ক ভাবনায় এই নারী ছিলেন তৎকালীন গ্রিসে অসাধারণভাবে অগ্রসর। এই অনন্য প্রতিভাবান নারীর নাম আসপাসিয়া। তাঁর জ্ঞান বা পাণ্ডিতের পরিধি মাপার জন্য এ কথাটাই যথেষ্ট যে, তৎকালীন গ্রিসের স্বর্ণযুগের সবচাইতে প্রতিভাবান মনীষী হিসেবে যে সক্রেটিসকে আমরা চিনি, তিনিও এই মহীয়সী নারীর একান্ত বাধ্যগত ছাত্র ছিলেন। আসপাসিয়াকে জীবন-সঙ্গী পেয়ে পেরিক্লিসের পরিস্থিতিও খানিকটা সেরকম ছিলো। আবেগ আশ্রয়ী অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে যে পেরিক্লিস সর্বগ্রিসীয় সমাজে সুনামধারী ছিলেন, আসপাসিয়ার একান্ত সহযোগিতা পাওয়ার পর থেকে তিনিও আর কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতায় আসপাসিয়ার লিখিত নোট ছাড়া মোটেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন না। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ, ন্যারেটিভ নির্মাণ, কূটনৈতিক বয়ান সবকিছুতেই আসপাসিয়ার হোম-ওয়ার্ক পেরিক্লিসের স্বপ্নের কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দারুনভাবে সহায়ক ছিলো।
আসপাসিয়া এথেন্সের রাজনীতিতে এতটা সহায়ক শক্তি হলেও তাঁর স্থান থেকে গিয়েছিল অন্দরমহলে। পেরিক্লিস তাঁকে এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা কিছুই বানাননি। এটা এই মহীয়সী নারীর প্রতি পেরিক্লিসের কোনো অবিচার নয়। বরং এটা ছিলো তৎকালীন গ্রিসীয় গণতন্ত্রের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা। কোনো নারী, দাস, এমনকি অন্য রাজ্য থেকে আসা কোনো ব্যক্তি তখন এথেন্সের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারত না। এমনকি তাদের কোনো ভোটাধিকারও ছিলো না। সার্বিকভাবে নারীদের অবস্থা ছিলো তুলনামূলকভাবে আরব্য ইতিহাসের আইয়ামে জাহেলিয়ার চাইতেও নাজুক। তৎকালীন গ্রিসের নারীরা ছিলেন একেবারেই পর্দানশীল। পুরুষের সহযোগিতা ছাড়া বিশেষ প্রয়োজনেও তারা স্বাধীনভাবে ঘরের বাইরে আসতে পারতেন না। পেরিক্লিসের আমলে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকেও নারীদের উপরে এধরনের গৃহবন্দী অপসংস্কৃতি আরোপিত ছিলো। এসব সত্তে¡ও কিছু নারী মাঝে মধ্যে বাইরে বের হতেন। এদের অধিকাংশকেই দুশ্চরিত্রা নারী বলে অবজ্ঞা করা হতো।
আসপাসিয়াও এই অভিযোগের অথবা অপবাদের শিকার ছিলেন। তাছাড়া তিনি ছিলেন অ-এথেন্সেনীয়, সেই সময়ের বিচারে বিদেশীনি। থাকতেন এথেন্সের শহরতলী বা আগোরা থেকে কিছুটা দূরে কেরামেকাস (Kerameikos) নামক তথাকথিত এক অভদ্র পল্লীতে। এমন এক অনাগরিক এবং অসভ্য অঞ্চলের বিতর্কিত নারীকে পেরিক্লিস অঘোষিত উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর প্রাসাদে স্থান করে দিয়েছিলেন এবং তৎকালীন অনেক বড় বড় নেতার উপরে তাঁর স্থান দিয়েছিলেন এটাই বরং তৎকালীন বিচারে বৈপ্লবিক ব্যাপার ছিলো। কোনোরকম টেকনোক্র্যাট ব্যবস্থা বা অন্ততপক্ষে নারী কোটা থাকলে পেরিক্লিস সে সুযোগ হয়তো কাজে লাগাতেন।
এথেনীয় গণতন্ত্র ঘষামাজা করে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত আছে। কিন্তু এই গণতন্ত্র কি কোনো না কোনোভাবে প্রাচীন এথেনীয় গণতন্ত্রের দুর্বল দিককে ধারণ করে চলছে? তৎকালীন গ্রিসে নারী নেতৃত্বকে যেভাবে দেখা হতো আজকের একবিংশ শতাব্দীতে তা কাম্য হতে পারে না। নারীরা এখন নিজ মেধায় চন্দ্রজয় করে চলছে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সাহিত্য এবং সার্বিকভাবে শিক্ষা দীক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশেও সে প্রবাহ যথেষ্ট বহমান। কিন্তু এসব সত্তে¡ও বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীর অবস্থা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত মাত্রায় অবস্থান করছে না; বরং বলা যায় তাদের অবস্থা নিতান্তই নাজুক। এখনো এদেশে সংসদ সদস্য হিসেবে নারীদের জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। কোটা সাধারণত দুর্বল, পিছিয়ে পড়া বা এক ধরনের দুর্দশাগ্রস্থ শ্রেণির জন্য প্রযোজ্য করা হয়। তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে, আমাদের দেশের নারীরা কি আনুষ্ঠানিকভাবেই এধরনের সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য অথবা সাবঅল্টার্ন হিসেবে নিজেদের মেনে নেবেন?
বাস্তবতা যাইহোক বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতা উল্টালে নারীদের যোগ্যতার প্রমাণ কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। এ দেশের গৌরবজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রাম, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ জুলাই আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ক্রমাগতভাবে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কিন্তু কী পেয়েছেন এদেশের নারী সমাজ? ঘটনার পরিক্রমায় বেশ কিছু নারী নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে আসীন হলেও সংখ্যাতাত্তি¡ক বিচারে তা কি পর্যাপ্ত? যদিও সংখ্যাতাত্তি¡ক হিসাব তেমন জরুরি নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যাদের যোগ্যতা আছে এবং তা প্রমাণিত এমন সব নারীদের কেবল নারী হওয়ার কারণে সুযোগ না দেওয়ার ঘটনা কি এদেশে ঘটেছে না? যোগ্যতার জেন্ডারগত কোনো তারতম্য নেই; এদেশে একজন বেগম খালেদা জিয়া হতে পারে তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দিকে আমরা যদি চোখ রাখি, তাহলে দেখতে পাবো যে কয়জন নারী সাংসদ সংসদ সদস্য হিসেবে ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে কাজ করছেন তারা এখন পর্যন্ত প্রশংসনীয়ভাবেই তাদের দায়িত্ব পালন করে চলছেন। তবে এর পাশাপাশি একটি বিষয় হতাশাব্যঞ্জক তা হলো সংরক্ষিত নারী- আসনে সরকারি দল এবং বেসরকারি দল যাদেরকে মনোনয়ন দিয়েছেন তাদের মধ্যে অনেকেই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত যোগ্য এবং পরীক্ষিত। এসব নেত্রীদের যদি সরাসরি নির্বাচনের সুযোগ দেওয়া হতো তাহলে এদের অনেকেই হয়তো ভালো করতেন। এতে তাদের রাজনৈতিক জীবনও আরো সুন্দরভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু বর্তমান রাজনীতিক বাস্তবতায় এদেশে এখনো নারীরা তাদের নিজ নিজ দল থেকেও যথাযোগ্য মর্যাদা পাচ্ছেন বলে মনে হয় না। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল ধর্মকে নিজস্ব মতাদর্শগত নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দেখিয়ে নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে এধরনের দলগুলোর মধ্যে অধিকাংশই আন্দোলন সংগ্রাম থেকে শুরু করে ভোটের ক্যাম্পেইনে ব্যাপকভাবে নারীদের ব্যবহার করছেন, অথচ সরাসরিভাবে নির্বাচিত করে নারী নেতৃত্বকে বিকশিত করার সুযোগ করে দিচ্ছে না। কেউ কেউ নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বৈধতার প্রশ্ন তুললেও সংরক্ষিত আসনে গিয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার দলীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়ে সে জায়গায় নারীদেরকে ঠিকই মনোনয়ন দিচ্ছে। উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি ব্যাপক সংখ্যক পরীক্ষিত নারী-নেত্রীদের ধারক হওয়া সত্বেও সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নে নারী নেতৃত্বকে যথাযোগ্য মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকাও আশাব্যঞ্জন নয়।
জুলাই আন্দোলন দানা বেঁধেছিল বৈষম্যের নিপাত ঘটাতে। নানা ধরনের কোটা সিস্টেম বন্ধ করে সব নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা ছিলো এই আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। ৫ আগস্ট এর পর থেকে আজ পর্যন্ত নানাভাবে বিশেষ সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা খোদ বিপ্লবীদের একাংশের মধ্যেই লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমান সংসদ অধিবেশনগুলোতে যারা জুলাই সনদ, সংস্কার এসব নিয়ে সরব হচ্ছেন তারাও জুলাই সনদ এর নীতি অনুযায়ী নারীদের সংসদ সদস্য হিসেবে সরাসরি নির্বাচনের শর্ত মানেননি। এদিক থেকে সরকারি দল এগিয়ে থাকলেও নীতিমালা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। তবে সরকার যেসকল নারীবান্ধব কর্মকাÐ শুরু করেছে তা ছোট হলেও আসার সঞ্চার করে। সমাজের প্রান্তিক পর্যায় থেকে নারীদেরকে শক্তিশালী না করা পর্যন্ত সার্বিকভাবে নারী নেতৃত্বের বিকাশ সম্ভব নয়। তাছাড়া ধর্মের ভুল ব্যাখ্যার সঠিক জবাব তুলে ধরা এবং নানা রকম অপসংস্কৃতিকে মোকাবেলা করা নারীদের নেতৃত্ব বিকাশের বিষয়টিসহ সর্বক্ষেত্রে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পূর্ব শর্ত। প্রকৃতপক্ষে মানুষের মনোজগতে পর্যাপ্ত সংস্কার আনায়ন ছাড়া কোনো কেতাবি সংস্কার দ্বারা সমাজের কোনো কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে না।
লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]