মতামত

অগণতান্ত্রিক ধারার গণতন্ত্র

আহমেদ তেপান্তর

একটি প্রশ্ন মনে প্রায়শই জাগে, বাঙালি বা বাংলাদেশি যে নামেই ডাকা হোক, তারা সত্যি কি গণতন্ত্রকে ধারণ করার অযোগ্য? হয়তো এমন প্রশ্ন হতাশা থেকেই জন্ম। ঔপনিবেশিক ইংরেজ যুগ বাদই দিলাম, পাকিস্তান কি বাংলাদেশ সবসময় ধরেই তো বাঙালির গণতন্ত্রের জন্য আক্ষেপ কিংবা লড়াই দেখতে পাই। সবই কি প্রতারণা? হয়তো তা নয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এই মাটিতে গণতন্ত্রের লড়াইয়ের সবসময়ই ছদ্মবেশী প্রতারক শক্তিকে দেখা গেছে। গণমানুষের গণতন্ত্রের লড়াই চূড়ান্তপর্বে ছিনতাই হয়েছে ওইসব শক্তির দ্বারা। রাজপথ, কলকারখানা, মাঠ-জমিনসহ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের জঙ্গি লড়াইও এক সময় দেখা গেল ছিনতাই হয়ে গেছে সেই ছদ্মবেশীদের দ্বারা।

যে শ্রেণীটি বরাবরে এদেশ শাসন করে এসেছে তারাই গণতন্ত্রের হত্যা কিংবা ছিনতাইকারী। সেই পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পশ্চিমাংশের মতো পূর্বাংশেও যতবারই শোষিত গণমানুষের জন্য আন্দোলন করেছে গণতন্ত্রের জন্য ততবারই তা ছিনতাই হয়েছে। এ কাজটি করেছে কখনো বাকশাল, সামরিক স্বৈরাচার, কখনো সামরিক ছত্রছায়ায় বেসাময়িক স্বৈরাচার। আজ পর্যন্ত এমন দৃষ্টান্ত কেউ দিতে পারবে না যে, ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে কোনও শাসকদল জনগণের কাছে দেয়া ওয়াদার বরখেলাপ করেনি, অতীতে করেছে, চলমান সময়ে করছে, আগামীদিনেও করবে। এসব শাসকের কাছে যারা জনমঙ্গলের জন্য গণতন্ত্র আশা করেন তারা নিছক মূর্খেও রাজ্যই বসবাস করেন।

ক্ষমতায় থাকতে এসব দল জনগণের সঙ্গে যেসব অন্যায় আচরণ করে, নির্বাচন এলে তারা ক্ষমা বা দুঃখ প্রকাশের অভিনয় করে। সাধারণ মানুষ, যারা মার খেতে খেতে পিঠে চামড়া শক্ত করে ফেলেছে, তারা তাদের ক্ষমাও করে দেয়। তারপর ক্ষমতায় এসেই আসল দানবীয় রূপটি প্রকাশ করে। তখন জনগণ ভোটের জন্য হায় আফসোস করে। অর্থহীন সেই গণ-আক্ষেপ। ঘুরেফিরে তারাই পুনরায় ক্ষমতায় আসে। জনগণ যেন এসব গণতন্ত্র আর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষাকারী প্রতারক দলের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। এমনটা না হয়ে পারে না, কেন না তৃতীয় বিকল্পটি আবার নেই, যেখানে জনগণ আশ্রয় নিতে পারে। এর বদলে আসে কেবল কখনো চোর, কখনো বাটপার।

রাজনীতির নামে দেশ শাসনের নামে এই অপশক্তির হাতে পড়ে একাত্তরের রক্তাক্ত যুদ্ধ আর আত্মত্যাগটাই বৃথা হয়ে গেল। আর আত্মত্যাগটাই বৃথা হয়ে গেল। কেবল একাত্তর পরবর্তী নয়, সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়ে মুক্তি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, শান্তিজনগণকে শোষণ করেছে, অপমান পদদলিত করছে। ‘ময়নামতি’র সিনেমার সেই হ্যাবলামার্কা চরিত্র মতির মতো দশা আমাদের জনগণের। ময়নাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধান্দাবাজ পাখিভাই বোকা মতির অমৃত খেয়েই চলে। ময়না তার অধরা থেকেই যায়। ধূর্ত পাখি ভাইয়েরা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা আর ধর্মরক্ষার নামে জনগণের কাছ থেকে ভোটের ‘অমৃত’ চেটেমুখে খেয়েই যাচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আজতক কোনও রাজনৈতিক দলই গণতন্ত্রটা কি, গণতন্ত্রের আলোকে জনগণ কী কী পেতে পারে বা দিতে পারে সেসব বলে না। এটা মানি না, এটা চলবে না, গদিচ্যুত করতে হবে, গদিটা আমার চাই-এই নিয়ে শেয়ালের মতো চেঁচানো ছাড়া অন্য কোনও আবদার নেই। দেশ রসাতলে যাক, তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। গদিটা চাই, জনগণের স্বার্থে নয়, লুটপাটের জন্য। দেশ হচ্ছে বাঘের কবরে পড়ে তাড়া খাওয়া হরিণ। হরিণ দখলের জন্য। পেট ভরে বাঘ চলে গেলে চলে হায়েনাদের সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণ এবং হরিণ দখল। এই হরিণ খাওয়ার লড়াইকে আমাদের দেশে বলা হয় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াই।

বাংলাদেশের জনগণ সকল শাসকদের হাতে চারদিক থেকেই অবরুদ্ধ। দেশে বিদেশি শাসকচক্র, এনজিও, পুঁজিপতি শিল্পপতি লুটেরা শ্রেণীতো আছেই সঙ্গে আছে বুদ্ধিচর্চার ধূর্ত শেয়ালেরা। এরা জনগণের চেতনাকে দখলে নিয়ে ধোঁকা দেয়। এরা চেতনাকে বিশুদ্ধতার নামে নিজেদের পকেট ভারি করছে। এটা করছে চিন্তার নামে, উদারবাদ এমনকি বিকৃত সমাজতন্ত্রের নামেও। দেশি-বিদেশি পয়সা খাওয়া ভাড়াটে এসব চিন্তচর্চাকারীগণ দেশের সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট। এরা হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের মগজ ধোলাইয়ের বিদেশি ভাড়াটে। নিজেদের মেধাকে ভাড়া দেয় তারা, বিনিময়ে ভাল খেয়েদেয়ে বেঁচেবর্তে আছে। এত হীনতা, এত স্বার্তপরতা আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকারীগণ নানাভাগে বিভক্ত লাসক দলগুলোর দ্বারা লালিত পালিত। এরা একবার ভাবে না তাদের ভূমিকা কীভাবে দেশের সর্বনাম করছে। আশ্চর্য এই এরা ধর্মের ভেতরও সমাজতন্ত্র খোঁজে।

তবে এটা ঠিক নয় যে, সৎ দেশ প্রেমিক বুদ্ধিচর্চাকারীগণ নেই। এরা অবশ্যই সংখ্যায় কম এবং প্রচারবিমুখ। লুটেরা শ্রেণি নিয়ন্ত্রিত প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এদের জনগণের কাছে তুলে ধরতে ভয় পায়। এরা রাষ্ট্র থেকে কোনও সুবিধা গ্রহণ করেন না। রাষ্ট্রের সর্বসুবিধা গ্রহণকারী সুখভোগী ভুয়া আর অসৎ বুদ্ধিচর্চারীগণও তাদের এড়িয়ে চলে। তাদেরও মহান ব্যক্তিত্বের পাশে দাঁড়াতে সাহস পায় না ওই ধূর্ত শেয়ালেরা।

মোট কথা, দেশের হাল-হকিকত তাতে গণতন্ত্র যে নিরাপদে আছে এমনটা ভাবা যায় না। চারদিকে কেবলই অন্ধকার। জনগণের সামনে বসবাস জায়গাটা খুঁজে পেতে সত্যি কষ্ট হয়। বিশ্বাসের জায়গাটা ভেঙ্গে পড়ছে খুবই দ্রুত। চারদিকে কেবল কোলাহল। কাড়াকাড়ি, কামড়া-কামড়ির আর শুয়োরের ঘোঁৎ ঘোঁৎ শব্দ। উন্নয়নের টাকা নিয়ে ভাগাভাগি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি চলছে ঊর্ধ্বগতিতে। এসব কথা জনগণ শুনছে কান পেতে আর অসহায়ের মতো চেয়ে চেয়ে দেখছে। এই বুঝি তাদের ভোটের ডিজিটাল গণতন্ত্রের হাল! একদিন নয়, দু’দিন নয়, বছরের পর বছর যুগের পর যুগ গত হলো অর্ধশতাব্দের ওপর সময় বয়ে গেল, গণতন্ত্র কী আর জানা গেল না। ধরা গেল না। পাওয়া তো দূরের কথা।

চেনা হলো না গণতন্ত্রের শক্রমিত্র। শত্রুকে মিত্র ভেবে লড়াইয়ে কাল গেল কেটে গণতন্ত্রের নাম করে বারবার রঙ বদলে আসে দেশশাসন করতে গণতন্ত্রের নাম করে বারবার রঙ বদলে আসে দেশশাসন করতে গণতন্ত্রের দুশমন। জনগণ তাদের চিনল না। ছদ্মবেশটা পারলো না খুলতে। এই দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারের দুঃসময়ের দিকে তাকিয়ে হাতাশাবাদীদের মতোই মনে কেবল সন্দেহ লাগে, এদেশের জনগণ কি গণতন্ত্রের অযোগ্য? আসলে অবস্থাটা সৃষ্টি করেছে গণনির্যাতনের ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে না রেখে ভুয়া গণতন্ত্রকে সামনে তুলে ধরে। গণতন্ত্রকে ধারণ করার যোগ্যতা অবশ্যই জনগণের আছে। সে জন্য চাই সেই প্রজ্ঞা, যা ভুয়া গণতন্ত্রীদের চিহ্নিত করতে সক্ষম। জনগণের মধ্যে সেই প্রজ্ঞার আলো জ্বালাবার দায়িত্ব আত্মত্যাগি, নির্লোভ, খাঁটি দেশ প্রেমিক রাজনৈতিক দলের। সেই দলই চাই সবার আগে। সবার সামনে।

কোথায় সেই দল? দল না থাকুক, কিংবা প্রচারের বাইরে অস্পষ্ট অবস্থায় থাকুক, সৎ দেশ প্রেমিক মানুষ নিশ্চয়ই আছে। ওরা আছে দেশের এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এবং অসংগঠিতভাবে। ওদের খুঁজে বের করতে হবে, একত্রিত হতে হবে, লড়াইয়ের দল বানাতে হবে। এরাই গণতন্ত্র ধারণ করার যোগ্য মানুষ, যোগ্য নাগরিক। এবার ওরাই আসুক। আর দেরি নয়, সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে খুবই দ্রুত। এ না হলেই সর্বনাশ!

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সাননিউজ/আরএ

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

ঈদের আগে কমলো স্বর্ণের দাম

ঈদুল আজহার আগে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম কমানোর সি...

রাশিয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারালেন কিশোরগঞ্জের যুবক

ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন কিশোরগঞ্...

শিশুদের ওপর বর্বরতা বন্ধ করার তাগিদ ইউনিসেফের

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সের প...

লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে সাকিব

এবার লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে খেলবেন সাকিব আল হাসান। শ...

নিউইয়র্কের মেয়র মামদানির সঙ্গে জায়েদ খান, কী কারণ

ঢালিউড অভিনেতা জায়েদ খান শুক্রবার (২২ মে) রাতে ফেস...

অগণতান্ত্রিক ধারার গণতন্ত্র

একটি প্রশ্ন মনে প্রায়শই জাগে, বাঙালি বা বাংলাদেশি...

হামে শিশুমৃত্যু থামছেই না

দেশে হাম ও উপসর্গে শিশুমৃত্যু থামছেই না। পরিস্থিতি...

এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা গ্রেপ্তার

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব তার...

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জুবায়দুর রহমানের পদত্যাগ

বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক...

অভিযোগপত্র জমা, শুনানি ১ জুন

ঢাকার পল্লবীর সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা