আজারবাইজানের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরার ওপর নতুন করে কড়াকড়ি আরোপের জেরে দেশটির সমাজ ও রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। স্কুল প্রাঙ্গণে প্রবেশাধিকার বঞ্চিত হওয়া এবং বাকবিতণ্ডার জেরে এই বিতর্ক এখন সাধারণ শিক্ষক ও অভিভাবকদের ব্যক্তিগত সংকটেও রূপ নিয়েছে।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে পোশাকবিধি সংক্রান্ত নীতিমালা দেশের ভেতর রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে।
হিজাবের নতুন বিধিমালার খড়্গ ও শিক্ষকদের ভোগান্তি : ২৩ বছরের বর্ণিল শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ইংরেজি শিক্ষিকা গুলশান আলিয়েভা সম্প্রতি মাথায় হিজাব পরে কর্মস্থলে গেলে তাকে স্কুলে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। এমনকি বাকুতে তার নিজ মেয়েকেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
আলিয়েভার দাবি, দেশের শ্রম আইনের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে সব ধরনের বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ গত মাসে জারি করা নতুন পোশাকবিধিমালায় সরাসরি হিজাবের নাম না নেওয়া হলেও ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে শিক্ষাঙ্গনে এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাক পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নব্বই শতাংশের বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশটিতে এই আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হলে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেয়। নতুন বিধিমালা লঙ্ঘন এবং জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে আটকের ঘটনাও ঘটেছে।
রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দ্বন্দ্ব : মুসলিমপ্রধান এই রাষ্ট্রে হিজাব বিতর্ককে কেন্দ্র করে জনমত বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে বাকু শহরের বাসিন্দা তিমুর রাজায়েভের মতো নাগরিকদের মতে, আজারবাইজান একটি কড়া ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারের নির্ধারিত অভিন্ন পোশাকবিধি সবার মেনে চলা উচিত। ১৮ বছরের কম বয়সীদের হিজাব পরার ক্ষেত্রে তা অভিভাবকদের প্রভাবে হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে, ককেশাস মুসলিম বোর্ডের প্রধান শেখ-উল-ইসলাম আল্লাহশুকুর পাশাজাদে হিজাবকে ধর্মীয়ভাবে বাধ্যতামূলক উল্লেখ করে এর রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। মানবাধিকার কর্মী ও বিশ্লেষকদের একটি অংশ একে সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। আইনগত প্রতিকার পেতে ক্ষতিগ্রস্তদের আদালতের দারস্থ হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন অনেকে।
তুরস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন : হিজাব ইস্যুটি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আঞ্চলিক মিত্রদের সম্পর্কেও ছায়া ফেলেছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ানের উপদেষ্টা ওকতাই সারাল আজারবাইজানের এই পদক্ষেপকে 'অগ্রহণযোগ্য' ও বিশ্বাসের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন।
এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাকু। ক্ষমতাসীন নিউ আজারবাইজান পার্টি সারালের এই বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আখ্যা দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, এ ধরনের মন্তব্য দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাংবিধানিক মারপ্যাচ ও বর্তমান পরিস্থিতি : আজারবাইজানের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা—উভয় নীতিই সমান্তরালে স্বীকৃতি পেয়েছে। একদিকে ৭ ও ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিশ্চিত করা হলেও, অন্যদিকে ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকদের বিবেক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুই সাংবিধানিক নীতির বাস্তবায়ন এবং সামঞ্জস্য বিধান নিয়ে দেশজুড়ে এক জটিল আইনি ও সামাজিক সংকট তৈরি হয়েছে।
সান নিউজ / রাজীব