দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ব্যাপক পরিসরে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খাদ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন ল্যাব স্থাপন, জনবল বাড়ানো, খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ড আধুনিকায়ন এবং গবেষণা কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। শাক-সবজি, চাল, ডিম, দুধ, মাছ, মাংসসহ সব ধরনের খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যমান খাদ্য নিরাপত্তা আইন ও নির্দেশিকাগুলো পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এখনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই, সেগুলোর জন্য নতুন মান ও নির্দেশিকা প্রণয়নের কাজ চলছে।
খাদ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদান যেমন—রাসায়নিক দূষণ, রোগজীবাণু, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিক, মাইকোটক্সিন, প্রিজারভেটিভ ও অন্যান্য সংযোজকের সহনীয় মাত্রা বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে নির্ধারণ ও হালনাগাদ করা হবে। পাশাপাশি খাদ্যে তেজস্ক্রিয়তার গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণ এবং খাদ্য পরীক্ষাগারগুলোর আধুনিকায়নের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিএফএসএ সূত্র জানায়, খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকি মূল্যায়ন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। আমদানি করা খাদ্যের মান যাচাই, মোড়কজাত খাদ্যের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের নীতিমালা এবং খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন প্রবিধান তৈরির কাজও চলছে।
এদিকে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা বাড়াতে খাদ্য ব্যবসায়ী, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক, কর্মী ও স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণের আওতা বাড়ানো হচ্ছে। বাজার, খাদ্য বিক্রয়কেন্দ্র ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অভিযান এবং নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে।
বিএফএসএ সচিব শ্রাবস্তী রায় বলেন, একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য পূরণে সরকার আইন প্রণয়ন, নীতিমালা তৈরি এবং কার্যকর বাস্তবায়নে কাজ করছে। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈতিক চর্চা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
বিএফএসএ সদস্য (আইন ও নীতি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে দেশে বর্তমানে ৪৭টি পরীক্ষাগারের মাধ্যমে খাদ্যের মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজার তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে জনবল সম্প্রসারণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দ্রুত খাদ্যের মান যাচাইয়ের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে মিনি ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে দেশব্যাপী কর্মশালা, সেমিনার ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হচ্ছে।
নরসিংদী ও গাজীপুরে কয়েকজন শিশুর শরীরে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় এর উৎস ও কারণ অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআর,বি-এর সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার কমিয়ে দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সান নিউজ/ জামান