বিশ্বকাপের শুরুতে কিছুটা অগোছালো ও ছন্দহীন মনে হলেও সময়ের সঙ্গে নিজেদের সেরা রূপে ফিরতে শুরু করেছে ব্রাজিল। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে দাপুটে জয় শুধু তিন পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং দেখিয়েছে কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলটি কতটা পরিণত ও ভয়ংকর হয়ে উঠছে।
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ম্যাচটির অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন দীর্ঘদিন পর জাতীয় দলের জার্সিতে ফেরা নেইমার। গ্যালারিভর্তি সমর্থকদের চোখ ছিল তার দিকেই। তবে মাঠের খেলায় আলো কেড়ে নেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড আবারও প্রমাণ করেছেন, বর্তমান ব্রাজিল দলের আক্রমণের প্রধান ভরসা তিনিই।
শুরুতেই আঘাত, ব্রাজিলের নিয়ন্ত্রণ
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে ব্রাজিল। প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্রুত গোলের দেখা পায় তারা। ডান প্রান্তে তরুণ রায়ানের দুর্দান্ত উপস্থিতি ও ভিনিসিয়ুসের ক্ষিপ্রতার সমন্বয়ে প্রথম গোলটি আসে।
এরপর আক্রমণের ধার আরও বাড়ায় সেলেসাওরা। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ক্রমাগত চাপে রেখে প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ভিনিসিয়ুস। গিমারায়েসের নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে করা গোলটি ছিল ম্যাচের অন্যতম আকর্ষণ।
ভিনিসিয়ুসের জাদুতে মুগ্ধ আনচেলত্তি
ম্যাচজুড়ে শুধু গোলই নয়, ড্রিবলিং, গতি এবং আক্রমণ সাজানোর দক্ষতায় নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান ভিনিসিয়ুস। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ কোচ কার্লো আনচেলত্তিও। ব্রাজিলিয়ান তারকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ভিনিসিয়ুস বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার এবং প্রতিনিয়ত নিজের খেলাকে আরও উন্নত করছেন।
বিশেষ করে হেড থেকে গোল করাটা ছিল ভিনিসিয়ুসের জন্য বাড়তি অর্জন। কারণ সাধারণত এই ধরনের গোল তার কাছ থেকে খুব বেশি দেখা যায় না।
রায়ানের উত্থান ব্রাজিলের জন্য বড় সুখবর
এই ম্যাচে আলোচনায় ছিলেন তরুণ ফরোয়ার্ড রায়ানও। প্রথম একাদশে সুযোগ পেয়ে তিনি দারুণভাবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। ডান উইংয়ে তার গতিময় উপস্থিতি, আক্রমণ তৈরি এবং রক্ষণে সহায়তা—সব মিলিয়ে তিনি ব্রাজিলের ভবিষ্যতের বড় সম্পদ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আনচেলত্তি ম্যাচ শেষে তার পরিণত মানসিকতা ও কঠোর পরিশ্রমের প্রশংসা করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বড় মঞ্চে এমন আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়েছে।
মাঝমাঠ ছন্দে ফিরতেই বদলে যায় ম্যাচ
প্রথমার্ধে কিছুটা বিচ্ছিন্ন মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পান গিমারায়েস ও পাকেতা। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে সংযোগ বাড়তে শুরু করলে ব্রাজিল আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয়ার্ধে গিমারায়েসের বুদ্ধিদীপ্ত পাস থেকে কুনহা গোল করে ব্যবধান ৩-০ করেন। এরপর ম্যাচ কার্যত ব্রাজিলের নিয়ন্ত্রণেই চলে যায়।
আলিসনের দৃঢ়তায় অটুট রক্ষণ
স্কটল্যান্ড দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণ বাড়ানোর চেষ্টা করলেও ব্রাজিলের গোলরক্ষক আলিসন ছিলেন দুর্ভেদ্য। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে তিনি প্রতিপক্ষকে গোলবঞ্চিত রাখেন।
বিশেষ করে ফ্রি-কিক ও হেড থেকে আসা কয়েকটি নিশ্চিত সুযোগ ঠেকিয়ে দলের বড় জয় নিশ্চিত করেন এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক।
নেইমারের ফেরা, ভবিষ্যতের বার্তা
ম্যাচের শেষভাগে মাঠে নামেন নেইমার। দীর্ঘ বিরতির পর জাতীয় দলের হয়ে খেলতে নেমে তিনি গোল না পেলেও কয়েকটি আক্রমণ গড়ে তোলেন। ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ভবিষ্যতে ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হেক্সা স্বপ্নে নতুন আত্মবিশ্বাস
বিশ্বকাপের শুরুতে যে দলটিকে নিয়ে প্রশ্ন ছিল, এখন সেই দলই শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছে। আক্রমণ, মাঝমাঠ ও রক্ষণ—তিন বিভাগেই ভারসাম্যপূর্ণ পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে ব্রাজিল।
ভিনিসিয়ুস, কুনহা, রায়ানদের আক্রমণ, মাঝমাঠে গিমারায়েস-পাকেতার নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণে আলিসনের নির্ভরতা—সব মিলিয়ে আনচেলত্তির দল এখন আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।
নকআউট পর্বের আগে ব্রাজিল স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা শুধু অংশ নিতে নয়, ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নেমেছে। বর্তমান ফর্ম ধরে রাখতে পারলে হেক্সা মিশনের পথে সেলেসাওদের থামানো যে কোনো প্রতিপক্ষের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
সান নিউজ/ কেএনআই