সংগৃহীত
জাতীয়

৩৯ কিলোমিটার ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর ওপর আন্তঃজেলা যানবাহনের চাপ কমানো এবং ঢাকার চারপাশে বিকল্প সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বলিয়ারপুর থেকে শুরু হয়ে প্রস্তাবিত এক্সপ্রেসওয়েটি সাভার, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দে গিয়ে শেষ হবে।

তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে একই মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি সংস্থা—বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) ও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। সওজ সমতলে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পক্ষে থাকলেও সেতু কর্তৃপক্ষ পুরো প্রকল্পটি উড়ালপথে নির্মাণের সুপারিশ করেছে। ফলে প্রকল্পের হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

সর্বশেষ পরিস্থিতিতে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে দুই সংস্থার কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে প্রকল্পের ধরন ও অ্যালাইনমেন্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে সমাধান না হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি

সেতু বিভাগ ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পটি পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেয়।

এরপর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করা হয়। সর্বশেষ হালনাগাদ সমীক্ষা ২০২৬ সালের ৭ জুলাই পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে ১৭টি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণ ঠিকাদার প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট, ভূমি অধিগ্রহণ, সরকারি আর্থিক সহায়তার ধরন এবং পিপিপি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর বিনিয়োগকারী নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগোবে।

প্রাথমিক হিসাবে প্রকল্পের নির্মাণ ও ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। ভৌত ও মূল্যজনিত জরুরি ব্যয় যুক্ত হলে মোট ব্যয় প্রায় ৪৩ হাজার ২০০ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। এর মধ্যে শুধু ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয় হবে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।

বলিয়ারপুর থেকে লাঙ্গলবন্দ

প্রস্তাবিত এক্সপ্রেসওয়ের দৈর্ঘ্য ৩৮ দশমিক ৯৮০ কিলোমিটার। তবে পাঁচটি ইন্টারচেঞ্জ ও সংযোগ সড়কসহ পুরো করিডরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬১ কিলোমিটার।

এক্সপ্রেসওয়ের পাঁচটি প্রধান ইন্টারচেঞ্জ হবে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের এন৫, আঁটিবাজার-কলাতিয়া সড়ক, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের এন৮, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের এন১১১ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এন১-এ। এসব ইন্টারচেঞ্জে যানবাহন ওঠানামার জন্য মোট ১৬টি র‌্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হলো আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার যানবাহনকে ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকায় প্রবেশ না করিয়ে রাজধানীর চারপাশ দিয়ে চলাচলের সুযোগ তৈরি করা। এতে বিশেষ করে আন্তঃজেলা মালবাহী যানবাহনের চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক্সপ্রেসওয়েটি পদ্মা সেতু করিডর ও এশিয়ান হাইওয়ে-১-এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করবে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা যানবাহন এবং চট্টগ্রাম, সিলেটসহ পূর্বাঞ্চল থেকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলগামী যানবাহনের একটি অংশ ঢাকার মূল শহরে প্রবেশ না করেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।

কেন পুরোটা উড়ালপথে নির্মাণের সুপারিশ

সেতু বিভাগের হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় পুরো এক্সপ্রেসওয়েটি এলিভেটেড বা উড়ালপথে নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় নিম্নভূমি, জলাভূমি, নদী-খাল, দুর্বল মাটি ও ভূমির সীমাবদ্ধতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রকল্প এলাকায় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদীর পাশাপাশি একটি পুরোনো ধলেশ্বরী শাখা ও ১১টি খালের ওপর সেতু নির্মাণের প্রয়োজন হবে। জরিপে ২৪৪টি পুকুরও চিহ্নিত হয়েছে, যার ১৩৯টিতে সারা বছর পানি থাকে।

সমীক্ষায় আংশিক উড়ালপথ ও আংশিক সমতল সড়ক নির্মাণের বিকল্পও বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এতে বেশি জমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় সড়ক ও বসতি বিচ্ছিন্ন হওয়া, পানি নিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

সেতু কর্তৃপক্ষের মতে, পুরোপুরি এলিভেটেড নির্মাণ করলে অতিরিক্ত কৃষিজমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন কমবে এবং যানবাহনের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করা সহজ হবে। হালনাগাদ সমীক্ষায় এক্সপ্রেসওয়ের নকশাগত গতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় চার লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কথা রয়েছে।

নির্মাণে ২২ হাজার কোটি, জমি অধিগ্রহণে ১৪ হাজার কোটি

হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৭ দশমিক ১৮৭ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট নির্মাণে প্রায় ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, নদী ও অন্যান্য বড় সেতু নির্মাণে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, পাঁচটি ইন্টারচেঞ্জে প্রায় ৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং টোল প্লাজা ও অন্যান্য সুবিধায় প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে।

অন্যদিকে ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পুনঃস্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।

পিপিপিতে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন আর্থিক কাঠামো বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ন্যূনতম ট্রাফিক গ্যারান্টি, ন্যূনতম রাজস্ব গ্যারান্টি, অ্যাভেইলেবিলিটি পেমেন্ট, বাজারভিত্তিক পিপিপি, হাইব্রিড মডেল এবং ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং (ভিজিএফ) রয়েছে।

পিপিপি কাঠামোতে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অর্থে মূল অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে টোল আদায়ের মাধ্যমে বিনিয়োগের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার কাঠামো বিবেচনা করা হচ্ছে।

২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণ শেষের লক্ষ্য

হালনাগাদ সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরকে প্রকল্পের প্রস্তুতিপর্ব এবং ২০২৭ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্মাণকাল হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনের জন্য তিন বছর এবং নির্মাণকাজের জন্য চার বছর সময় ধরা হয়েছে।

দরপত্র আহ্বান থেকে পছন্দের বিনিয়োগকারী নির্বাচন, আলোচনা, আইনি যাচাই, অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন এবং লেটার অব অ্যাওয়ার্ড পর্যন্ত প্রায় ২৭৪ দিন সময় লাগতে পারে বলে প্রাথমিক সূচিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে চূড়ান্ত অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণ এবং সেতু কর্তৃপক্ষ ও সওজের মধ্যে সমন্বয়। প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় হলেও চূড়ান্ত অনুমোদন, পিপিপি কাঠামো ও বিনিয়োগকারী নির্বাচন কত দ্রুত সম্পন্ন হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ঢাকার চারপাশে ইস্ট-ওয়েস্ট এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের ভবিষ্যৎ।

সান নিউজ/ হুমায়রা

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

বোয়ালমারীতে বাসের নিচে চাপা পড়ে থাকা শিক্ষার্থীর মরদেহ ৩ দিন পর উদ্ধার

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে বাস-ট্রাক সংঘর্ষের পর খাদে পড়ে যাওয়া বাসের নিচে চাপা পড়...

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় টানা চতুর্থ দিন বাড়ল তেলের দাম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্...

২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা দুই মাস পেছানোর ভাবনা

২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রায় দুই মাস পিছি...

লাগামহীন ‘বাংলার টেসলা’, ঢাকার সড়কে আতঙ্ক

ঢাকার রাত যত গভীর হয়, শহরের ব্যস্ততা ততটা কমে এলেও বিদ্যুতের চাহিদা সবসময় একই...

আসছে ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা ২’

২০১১ সালে মুক্তি পায় জোয়া আখতারের সিনেমা ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা&rsq...

ডেঙ্গুতে আরও ২ মৃত্যু, নতুন ভর্তি ৬৭১

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন...

ওজন নিয়ন্ত্রণে আদা চা কতটা কার্যকর? খাবেন যেভাবে

খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, ভারী লাগা কিংবা হজমের অস্বস্তিতে অনেকেই ঘরোয়া সমাধান খোঁ...

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে: রিজভী

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সমমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে হবে...

দুদক কোনো চাপের মধ্যে নেই: চেয়ারম্যান

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কোনো ধরনের চাপের মধ্যে নেই এবং স্বাধীনভাবে কাজ করবে...

নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে ডিএসসিসির সমন্বিত অভিযান

নাগরিক সেবার মান নিশ্চিত করতে রাজধানীর সাইন্সল্যাব ও সিটি কলেজ এলাকায়...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা