খেলা

বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গনে শোক, আবদুস সাদেকের বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিশ্বকাপ ফুটবলের জমজমাট উন্মাদনায় যখন কাঁপছে চারপাশ, ঠিক তখনই দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এলো এক বিষাদের ছায়া। নিভে গেল দীর্ঘ সময় ধরে আলো ছড়ানো এক অনন্য বাতিঘর। গতকাল আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন স্বাধীন বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিভাবক ও কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব আবদুস সাদেক। ফুটবল ও হকি,দুই মাঠেই সমান দ্যুতি ছড়ানো এই বটগাছের প্রস্থানে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

মাঠ কাঁপানো 'ডাবল ক্যাপ্টেন' ও অনন্য রেকর্ড:
বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে আবদুস সাদেকের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার জন্য। তারকা ফুটবলারদের ভিড়েও ১৯৭২ সালে তাঁর নেতৃত্বেই মাঠে অভিষেক হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী ঢাকা আবাহনী ক্লাবের।

ঐতিহাসিক নেতৃত্ব:
তিনি একই সাথে আবাহনী ক্লাবের ফুটবল ও হকি—উভয় দলেরই প্রথম অধিনায়ক হওয়ার এক বিরল গৌরবের অধিকারী।

জাতীয় দলের ত্রাতা:
স্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের প্রথম অধিনায়ক ছিলেন তিনিই। পরবর্তীতে খেলোয়াড়ি জীবন শেষে জাতীয় হকি দলের কোচের দায়িত্বও সফলভাবে পালন করেন।

অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন:
১৯৭৭ সালে ঘরোয়া ফুটবলে আবাহনী যখন প্রথমবার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়, তখন তিনি ছিলেন দলটির কোচ-কাম-খেলোয়াড়। তাঁর অধীনেই আবাহনী ফুটবল ও হকি—উভয় লিগেই অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
ষড়যন্ত্রের জবাব: ষাটের দশকের শেষের দিকে বাঙালি খেলোয়াড়দের পাকিস্তান জাতীয় দলে সুযোগ না দেওয়ার সব চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন তিনি। যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে পাকিস্তান জাতীয় হকি দলের হয়ে ইউরোপ সফরে ২০টি ম্যাচের মধ্যে ৮টিতেই খেলেন রাইট-হাফ পজিশনে।

সংকটে অবিকল্প 'সংগঠক':
আবদুস সাদেক শুধু মাঠের লড়াকু সৈনিক ছিলেন না, ছিলেন সংকট মোচনের এক দূরদর্শী কারিগর।
আবাহনীর বড্ড দুর্দিন (১৯৭৫): পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবাহনী ক্লাব যখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, অন্য অনেকে যখন গোপনে সরে যান, তখন আবদুস সাদেকই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে ক্লাবের হাল ধরেন। আজকের দেশসেরা আবাহনী তাঁর সেই ত্যাগের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।

হকি বাঁচানোর রূপকার:
বছর দশেক আগে দেশের হকি যখন চরম অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছিল এবং ক্লাবগুলো লিগ না খেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তখন তিনি ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসেন। স্থানীয় এক হোটেলে ক্লাবগুলোকে ডেকে শুধু বলেছিলেন, ‘তোমরা মাঠে যাও, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ওপর আস্থা রাখো।’ তাঁর সেই ব্যক্তিত্বের জাদুতে হকি আবার মাঠে ফিরেছিল। তিনি তিনবার হকি ফেডারেশনের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এবং সিনিয়র সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৫-র ঐতিহাসিক এশিয়া কাপ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:
আশির দশকে এশিয়ান কাপ হকি মানে ছিল বিশ্বকাপ সমতুল্য। বাংলাদেশে এমন আসরের আয়োজন করা তখন ছিল কল্পনাতীত। ১৯৮৫ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান হকি ফেডারেশনের সভায় পাকিস্তান, ভারত, জাপান ও মালয়েশিয়া আয়োজক হতে চাইলে আবদুস সাদেক ঢাকার নাম প্রস্তাব করে দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘বাংলাদেশের ওপর আস্থা রাখুন। দেখবেন ইতিহাসের সেরা আয়োজন করব।’ তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতায় সেবার ঢাকায় যে এশিয়া কাপ হয়েছিল, তা আজ পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আয়োজন হিসেবে স্বীকৃত।

আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন:
২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি আন্দ্রে নেগ্রে ঢাকা এসে আবদুস সাদেককে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠেছিলেন। তিনি মাইক হাতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন— "যে দেশে সাদেকের মতো এক্সপার্ট আছে, সেখানে বাংলাদেশের হকির এই অবস্থা কেন? সাদেকের বুদ্ধি কাজে লাগাও, ঠিকই এগিয়ে যাবে।"

ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া পরিবার:
আবদুস সাদেকের ক্রীড়া রক্ত ছিল পারিবারিক।
• তাঁর বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান ছিলেন ব্রিটিশ আমলের চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু।
• তাঁর ছোট ভাই, দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ছিলেন হকির তুখোড় খেলোয়াড়, যিনি পূর্ব পাকিস্তান যুবদলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

একটি অপূর্ণ স্বপ্ন এবং জাতির হাহাকার:
বর্তমান প্রজন্ম যখন হাতেগোনা সাফল্যকেই ইতিহাস মনে করে, তখন এই কিংবদন্তিদের গল্প আড়ালেই থেকে যায়। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল— দেশের সোনালি যুগের পাঁচ অভিভাবক আবদুস সাদেক, বশির আহমেদ, জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ শংকর হাজরা ও গোলাম সারোয়ার টিপুকে এক ফ্রেমে বন্দি করে একটি আড্ডার আয়োজন করা।

সতীর্থ গোলাম সারোয়ার টিপু বলেছিলেন, “সাদেক ভাই ছাড়া আয়োজন বৃথা।” প্রতাপ শংকর হাজরাও সাদেকের থাকার ওপর জোর দিয়েছিলেন। ওল্ড ডিওএইচএসের বাসায় গিয়ে প্রস্তাব দিলে আবদুস সাদেক খুশি হয়ে বলেছিলেন, “আমাদের একসঙ্গে বসিয়ে ছবি তুলবে, এ লোভ কি সামলানোর মতো! তবে একটু সময় দাও, শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।”

প্রথমে জাকারিয়া পিন্টু এবং এবার আবদুস সাদেক না ফেরার দেশে চলে যাওয়ায় সেই ঐতিহাসিক ফ্রেমটি আর কোনোদিন পূর্ণতা পাবে না। দরদমাখা কণ্ঠে ‘কীরে ভালো আছিস তো’ বলার মানুষটি চিরতরে বিদায় নিলেন। জাতি হিসেবে আমরা হয়তো গুটি কয়েক পুরস্কার ছাড়া এই রত্নকে তাঁর যোগ্য সম্মান দিতে পারিনি, আর সেই অবমূল্যায়নের হাহাকারই আজ দেশের হকি ও ফুটবল অঙ্গনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বিদায়, ক্রীড়াঙ্গনের বাতিঘর!

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

বদলগাছীতে খাস আদায় হাটে অনিয়মের অভিযোগ, সরকারি রাজস্ব লোপাটের আশঙ্কা

নওগাঁর বদলগাছীতে হাট ও বাজারে সরকারি খাস খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে অনিয়ম, স্বচ...

জামায়াত গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না: মুন্সীগঞ্জে মির্জা ফখরুল

মুন্সীগঞ্জে এক জনসমাবেশ ও পরিদর্শন কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসল...

চৌকায় ২০ জন পুশইন ঠেকাল বিজিবি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা সীমান্তে ২০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ...

শিশুদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগই জাতি গঠনের মূল : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘জাতি গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়...

নওগাঁয় জাতীয় ফল ও আম মেলা নিয়ে বির্তক, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত তিনদিনব্যাপী জাতীয় ফল ও আম মেলা...

হামে শিশুমৃত্যু: গাফিলতির দায় এড়ানো যাবে না

দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ন...

কাতারে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা: প্রাণ হারালেন সিলেটের ৫ বাংলাদেশি

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশি নাগরিকের...

ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের যোগ দিবস উদযাপন

ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন দ্বাদশ আন্তর্জাতিক যোগ দিবস (IDY) ২০২৬ উদযাপন করেছে।...

শিশু রিফাত হত্যা মামলায় ৫ জনের মৃত্যুদণ্ড

বগুড়ার শাজাহানপুরে আট বছর বয়সী শিশু রিফাত হোসেন হত্যা মামলায় পাঁচ আসামিকে মৃত...

এক বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’, গেজেট প্রকাশ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর স্মৃতি ও সাহিত্যকর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা