দেশের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ঘাটতি এবং প্রত্যাশিত বৈদেশিক সহায়তা না পাওয়ায় সরকারি ব্যয় নির্বাহে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, ঋণের সুদ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে সরকার চলতি অর্থবছরে ব্যাপক হারে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই সরকারের নিট ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। ফলে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে সরকারি ঋণগ্রহণ।
ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ ৬০ হাজার কোটির বেশি
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের শুরুতে সরকারের মোট ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। ১০ মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায়। এই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক—উভয় উৎস থেকেই ঋণ নেওয়া হলেও মূল বোঝা বহন করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।
রাজস্ব ঘাটতি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, সরকারের প্রধান আয়ের উৎস কর ও শুল্ক খাত। কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি এবং আমদানি কমে যাওয়ার কারণে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই কর আদায়ে ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকার বেশি, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকার বেশি, অথচ আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা।
বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর বাড়ছে নির্ভরতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১০ মে পর্যন্ত সরকারের নেওয়া ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে মাত্র ৫ হাজার ১১৫ কোটি টাকা এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে। বাকি ১ লাখ ৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে।
মূলত ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড বিক্রির মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফলে সরকারি ঋণের বড় অংশ এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণ সংকটের আশঙ্কা
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকার দীর্ঘ সময় ধরে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে থাকলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে সুদের হারেও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে নতুন অর্থ সৃষ্টি হয়, যা মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়া হলে তারল্যের ওপর চাপ পড়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সুদ পরিশোধেও বাড়ছে চাপ
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঋণের পরিমাণ যত বাড়বে, ততই বাড়বে সুদ পরিশোধের দায়। ইতোমধ্যে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। ঋণের অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে যথাযথভাবে ব্যবহার না হয়, তাহলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদে চাপ আরও বাড়তে পারে।
বৈদেশিক অর্থায়নেও অনিশ্চয়তা
সরকারের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ বিদেশি অর্থায়নের ধীরগতি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক সংঘাত এবং উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে প্রত্যাশিত বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ঋণনির্ভর ব্যয় ব্যবস্থাপনা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঋণও দ্রুত বাড়ছে।
তাদের পরামর্শ, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি করার মাধ্যমে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা প্রয়োজন।