গভীর অনুপ্রবেশের অভিযোগ: অরুণাচল প্রদেশের কংগ্রেস সভাপতি ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী বসিরাম সিরাম দাবি করেছেন যে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) সীমান্ত পেরিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার ভেতরে চলে এসে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থান নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর জোরালো অস্বীকৃতি: অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু এই অনুপ্রবেশের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন এবং সীমান্তে এ ধরনের কোনো অবৈধ প্রবেশের ঘটনা ঘটেনি বলে মত প্রকাশ করেছেন। কংগ্রেসের তদন্ত দাবি: গত আগস্টে সীমান্তবর্তী লাইমেকিং ও তাকসিং এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সিরাম দাবি করেছেন যে, আসাফিলার মতো কৌশলগত এলাকাগুলো প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে এবং এ বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। পূর্ববর্তী বিতর্ক ও সরকারি অবস্থান: এর আগেও স্থানীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো সীমান্তে চীনা তৎপরতা বৃদ্ধির অভিযোগ তুললেও ভারতীয় সেনাবাহিনী তা ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু সীমান্তবর্তী উঁচু ভূমিগুলোতে চীনের তৎপরতা বাড়ার কথা স্বীকার করেছিলেন।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক বাহিনীর অবৈধ প্রবেশের দাবি ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যটির মূল বিরোধী দল কংগ্রেসের শাখা প্রধান তথা সাবেক শিক্ষামন্ত্রী বসিরাম সিরাম সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, চীনা সামরিক বাহিনী সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় পঞ্চাশ থেকে ষাট কিলোমিটার গভীরে চলে এসেছে।
তবে তার এই বিস্ফোরক দাবিকে সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছেন অরুণাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু। আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে এ ধরনের কোনো অনুপ্রবেশের ঘটনা বাস্তবে ঘটেনি বলেই নিজের দৃঢ় বিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অভিযোগ করেন যে, আপার সুবানসিরি জেলার বিভিন্ন সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ-র জোয়ানরা ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। সীমান্ত অঞ্চলের বর্তমান প্রকৃত পরিস্থিতি উন্মোচন করতে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ বিচারিক বা উচ্চপর্যায়ের তদন্তেরও দাবি তুলেছেন তিনি।
সিরামের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে (২৬ থেকে ২৯ তারিখ) তার নিজের নেতৃত্বেই কংগ্রেসের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল দুর্গম সীমান্ত এলাকাগুলো সরজমিন পরিদর্শনে গিয়েছিল। রাজধানী ইটানগর থেকে যাত্রা শুরু করে নাচো হয়ে লাইমেকিং এবং তাকসিং অঞ্চলের সীমান্তবর্তী জনপদগুলোতে পৌঁছায় তাদের দলটি।
সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন কংগ্রেস নেতারা।
ওই পরিদর্শনের ভিত্তিতেই বিস্ফোরক দাবি করে সিরাম জানান যে, চীনা সৈন্যরা সীমান্তরেখা পেরিয়ে ভারতের ভূখণ্ডের ভেতরে প্রায় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার গভীরে অনায়াসে প্রবেশ করেছে। পাহাড়ের দুর্গম ও উঁচু পাহাড়ি চূড়াগুলো দখল করে চীনা সেনারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, আর ভারতীয় নাগরিক বা স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে নিচের উপত্যকায় অবস্থান করছেন। আসাফিলার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু এলাকা ইতোমধ্যে সম্পূর্ণভাবে প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এমনকি অনলাইন বা ডিজিটাল ম্যাপ থেকেও নির্দিষ্ট কিছু ভূখণ্ড রহস্যজনকভাবে মুছে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেন এই কংগ্রেস নেতা।
উল্লেখ্য, এর আগে গত জুন মাসে ‘নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’ নামের স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠনও তাকসিং এলাকার কাছাকাছি চীনা সেনার উপস্থিতি বৃদ্ধির জোরালো অভিযোগ তুলেছিল। যদিও সে সময় ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী সেই দাবিকে সম্পূর্ণ ‘ভুল, কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন’ বলে খারিজ করে দিয়েছিল।
এরপর গত আগস্ট মাসে অরুণাচল প্রদেশের পিপলস পার্টির একটি প্রতিনিধিদলও একই ধরনের অভিযোগ করে জানিয়েছিল যে, সীমান্ত এলাকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পয়েন্টে ভারতীয় জওয়ানদের টহল দিতে বাধা দিচ্ছে প্রতিপক্ষ।
এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু চীনা সেনার অর্ধশত কিলোমিটার গভীরে ঢোকার দাবি নাকচ করলেও, সীমান্তবর্তী উচ্চ ভূখণ্ডগুলোতে বেইজিংয়ের সামরিক তৎপরতা ও গতিবিধি যে অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে, তা অকপটে স্বীকার করেছিলেন।
সরকার এবং সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অনুপ্রবেশের এই তথ্য বারবার অস্বীকার করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কংগ্রেস সভাপতি। তার যুক্তি, যদি সীমান্তে কোনো ধরনের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড বা অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা নাই ঘটে থাকে, তবে স্থানীয় পাহাড়ি বাসিন্দারা কেন বারবার আতঙ্কের সুরে একই অভিযোগ তুলছেন? এ ধরনের গুরুতর বিষয়গুলোকে কেবল সাধারণ গুজব বলে উড়িয়ে না দিয়ে বরং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো সংস্থার মাধ্যমে এর সঠিক সত্যতা যাচাই করা উচিত বলে মত প্রকাশ করেছেন তিনি।
তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এসব দাবির সপক্ষে স্বাধীন বা নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে সুনির্দিষ্ট বা অকাট্য তথ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সান নিউজ / রাজীব