প্রার্থিতা ঘোষণা: সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মনোনয়নে জাতিসংঘের মহাসচিব পদের জন্য গত ২২ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হয়েছেন দেশটির বিশিষ্ট কূটনীতিক লানা নুসায়বেহ। কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা: জাতিসংঘে প্রায় ১১ বছর আমিরাতের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্ব এবং গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ (২৭২০ নম্বর প্রস্তাব) ভূমিকা রেখেছেন তিনি। পারিবারিক ঐতিহ্য ও যোগ্যতা: ফিলিস্তিনি রাজনীতিক পরিবারের সন্তান লানা হিব্রু ভাষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী এবং সরকারে ছুটি নিয়ে এই বৈশ্বিক লড়াইয়ে নেমেছেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি: নিজের প্রচারে তিনি প্রতিটি সরকারের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার পাশাপাশি "কাউকে জবাবদিহি না করার" দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। জটিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও চ্যালেঞ্জ: নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা, দেরিতে প্রার্থী হওয়া এবং লাতিন আমেরিকা থেকে প্রার্থী পাওয়ার অলিখিত প্রত্যাশার কারণে তাঁর পথ বেশ কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ইতিহাস গড়ার সুযোগ: জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নারী মহাসচিব পদে আসীন হননি; ফলে লানা বিজয়ী হলে তিনি হবেন সংস্থার প্রথম নারী এবং আরব বিশ্বের দ্বিতীয় মহাসচিব।
অক্টোবর ২০২৩। গাজায় যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন পরই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মঞ্চে দাঁড়িয়ে এক নারী কূটনৈতিক ভনিতা ছেড়ে সরাসরি কথা বললেন। সেদিন যাঁরা কক্ষে ছিলেন, তাদের অনেকেই হয়তো ভাবেননি, তিন বছর পর এই নারীই জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পদের দৌড়ে নামবেন।
তিনি লানা নুসায়বেহ। পাসপোর্টে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিক, কিন্তু শিকড় ফিলিস্তিনে। তার দাদা আনোয়ার নুসায়বেহ ছিলেন নামকরা ফিলিস্তিনি রাজনীতিক, আর বাবা জাকি নুসায়বেহ আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদের সহচর। তিনি হিব্রু ভাষাতেও সাবলীল। একসঙ্গে আরব, ফিলিস্তিনি ও আমিরাতি পরিচয় বহন করা, আবার ইসরায়েলের সঙ্গেও কথা বলতে পারা, এমন কূটনীতিক বিশ্বরাজনীতিতে বিরল।
গুতেরেসের উত্তরসূরি খোঁজার দৌড়ে তিনি দেরিতে আসা প্রার্থী। সর্বশেষ অনানুষ্ঠানিক ভোটে প্রত্যেক প্রার্থীই কার্যত ভেটোর মুখে পড়েছেন। তাহলে এই দেরিতে আসা মানুষটির সামনে সুযোগ কতটা? আর তিনি সফল হলে জাতিসংঘ কোন ইতিহাসের মুখোমুখি হবে?
নিউইয়র্কের নিরাপত্তা পরিষদের কক্ষে বছরের পর বছর যে নারীকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুখ হিসেবে দেখা গেছে, তিনি এবার নিজেই জাতিসংঘের সর্বোচ্চ পদের প্রার্থী। আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মনোনয়নের পর গত ২২ অক্টোবর তিনি নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করেন। প্রার্থিতার জন্য তিনি আমিরাত সরকারে ছুটি নিয়েছেন।
লানার পারিবারিক ইতিহাসেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির ছাপ আছে। তার দাদা আনোয়ার নুসায়বেহ ছিলেন পরিচিত ফিলিস্তিনি রাজনীতিক। তিনি জর্ডান সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় সামলেছেন এবং ষাটের দশকে যুক্তরাজ্যে দেশটির রাষ্ট্রদূত ছিলেন। বাবা জাকি নুসায়বেহ আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা শেখ জায়েদের সহচর ছিলেন এবং পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় দেশটির সরকারে অবদান রেখেছেন। লানার চাচা সারি নুসায়বেহ দার্শনিক এবং আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রেসিডেন্ট।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের মতে, ৪৮ বছর বয়সী লানা হিব্রু ভাষাতেও সাবলীল।
লানা কর্মজীবন শুরু করেন প্যারিসে ইউনেসকোর উপদেষ্টা হিসেবে, পাশাপাশি নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে গবেষণাও করেছেন। এরপর জাতিসংঘে কাটে তার এক দশকেরও বেশি সময়:
- ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘে আমিরাতের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন।
- তিনি সাধারণ পরিষদের সহসভাপতি এবং জাতিসংঘ উইমেনের নির্বাহী বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। আমিরাতের ২০২২–২০২৩ মেয়াদে দুবার নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্বও করেছেন।
- গাজা যুদ্ধ শুরুর পর তিনি ২৭২০ নম্বর প্রস্তাবের পেছনে মূল ভূমিকা রাখেন। এই প্রস্তাব গাজায় মানবিক সহায়তা দ্রুত পৌঁছানোর জন্য জাতিসংঘের একটি ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে।
নিজের ঘোষণায় তিনি বলেছেন, তিনি "প্রত্যেক সরকারের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলবেন এবং কারও কাছে জবাবদিহি করবেন না"। তার মূল বার্তা হলো আরও জরুরি ভিত্তিতে, আগেভাগে পদক্ষেপ নেওয়া এবং মতভেদ থাকা পক্ষগুলোকে একসঙ্গে আনা। তিনি মনে করেন, জাতিসংঘকে সব প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিতে হবে না, তবে যেখানে ভূমিকা রাখা সম্ভব, সেখানে উপস্থিত থাকতে হবে।
মানুষ লানার একটি কথা বিশেষভাবে মনে রেখেছে। লানার দুই ছোট ছেলে তাকে যেকোনো আলোচনার চেয়ে বেশি ধৈর্য ও জরুরি মনোভাব শিখিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
পথ কতটা কঠিন?
লানা সত্যিই মহাসচিব হবেন, এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। তিনি দৌড়ে নেমেছেন, এর বেশি কিছু বলা যায় না।
- তিনি দেরিতে আসা প্রার্থী এবং সাতজন প্রার্থীর একজন।
- নিরাপত্তা পরিষদে ছয় দফা ভোটেও পাঁচ স্থায়ী সদস্য (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স) সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো প্রার্থী পাওয়া যায়নি। গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩১ ডিসেম্বর।
- সবচেয়ে সাম্প্রতিক অনানুষ্ঠানিক ভোটে প্রত্যেক প্রার্থীই কার্যত ভেটোর মুখে পড়েছেন।
- কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান সর্বশেষ দফায় প্রয়োজনীয় ৯টি ভোট পেয়েছিলেন, কিন্তু স্থায়ী সদস্যদের দুজন তার বিপক্ষে ভোট দেন।
নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের অন্তত ৯টি ভোট লাগে এবং কোনো স্থায়ী সদস্যের ভেটো এড়াতে হয়। এরপর সাধারণ পরিষদ নিয়োগ দেয়। এ ছাড়া লাতিন আমেরিকা থেকে প্রার্থী আসার একটা অলিখিত প্রত্যাশাও রয়েছে।
বাধা অনেক, তবু সম্ভাবনাও বড়। জাতিসংঘের ইতিহাসে এখনো কোনো নারী মহাসচিব হননি। লানা নির্বাচিত হলে মিসরের বুতরোস বুতরোস-ঘালির পর তিনি আরব বিশ্বের দ্বিতীয় মহাসচিব হবেন। এ পর্যন্ত মনোনীত পাঁচ নারী প্রার্থীর মধ্যে তিনিই একমাত্র আরব।
বিশ্বরাজনীতির এই জটিল সমীকরণে লানা শেষ পর্যন্ত কতদূর যাবেন, তা বলবে আগামী কয়েক সপ্তাহের ভোটাভুটি।
সান নিউজ / রাজীব