মুখ্য হাইলাইটস:
প্রতিশ্রুতির জোরালো ঘোষণা: সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় পাকিস্তান তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তেহরান বৈঠক ও ত্রিপক্ষীয় চুক্তি: পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের উদ্যোগে ইরান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায় বৈঠকে পারস্পরিক যৌথ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত একটি নতুন লিখিত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট: হুতি বিদ্রোহীদের হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য বৃহত্তর যুদ্ধঝুঁকি এড়াতেই এই কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান অস্থিরতা ও সংঘাতের আবহে এক নতুন কৌশলগত জোটের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সম্প্রতি দেশটির জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের ‘আজ শাহজেব খানজাদা কে সাথ’ অনুষ্ঠানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন।
সেখানে তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছেন যে, ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র সৌদি আরবের ওপর যেকোনো বাহ্যিক আগ্রাসন প্রতিহত করতে পাকিস্তান তার সমস্ত সামর্থ্য ও শক্তি প্রয়োগ করবে। রিয়াদের নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা রক্ষা করাকে পাকিস্তান নিজেদের দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতোই সমান গুরুত্বের সঙ্গে দেখে থাকে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও তেহরান বৈঠক : সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করেছে। ওই কূটনৈতিক মিশনে ইরান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় সামরিক ও গোয়েন্দা কর্তাব্যক্তিরা একত্রিত হন।
তেহরানে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান নেতারা। বিশেষ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণ এবং এর জেরে সৃষ্ট আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতায় বৃহত্তর কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধ বেধে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই এই বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খাজা আসিফও স্বীকার করেছেন যে, আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল মূলত সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক চাপ ও সংঘাতের ঝুঁকি মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর সম্ভাব্য কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েও বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির নতুন মাত্রা : খাজা আসিফ তার বক্তব্যে একটি নতুন ও যুগান্তকারী আঞ্চলিক চুক্তির কথা প্রকাশ্যে এনেছেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তত তিনটি দেশ পারস্পরিক নিরাপত্তার স্বার্থে একটি লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। এই সমঝোতা স্মারকের মূল ভিত্তি হলো যৌথ প্রতিরক্ষা—অর্থাৎ জোটভুক্ত কোনো দেশের ওপর যদি কোনো ধরনের বিদেশি আগ্রাসন বা হুমকি নেমে আসে, তবে বাকি রাষ্ট্রগুলো একত্রিত হয়ে তা প্রতিহত করবে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, এই ত্রিপক্ষীয় অংশীদারত্ব কেবল মৌখিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং সুনির্দিষ্ট চুক্তির মাধ্যমে একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিক সম্পর্কের নতুন ভিত্তি : পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যকার সম্পর্ক বহু দশকের পুরোনো এবং এটি কেবল প্রচলিত কোনো কূটনৈতিক বা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির গণ্ডিতে আটকে নেই। খাজা আসিফ মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, দুই দেশের এই মিত্রতার শেকড় অনেক গভীর।
রিয়াদের প্রতি ইসলামাবাদের এই অকুণ্ঠ সমর্থন প্রমাণ করে যে, সংকটময় মুহূর্তে পাকিস্তান তার পরীক্ষিত মিত্রের পাশে থাকার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না। পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের বিশেষ উদ্যোগে আয়োজিত তেহরানের বৈঠকটি মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর মাঝে নতুন এক কৌশলগত ঐক্যের পথ সুগম করেছে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
সান নিউজ / রাজীব