বিশ্বজুড়ে মশাবাহিত প্রাণঘাতী রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ দিন দিন বাড়তে থাকার প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মতো সহজে প্রাপ্তব্য কার্যকর টিকা ‘কিউডেঙ্গা’র অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপে বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের মাঝে একধরনের স্বস্তি ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে এসেছে। প্রতিবছর লম্বা ছুটি পেলেই বিপুলসংখ্যক প্রবাসী পরিবারসহ নিজেদের জন্মভূমিতে যান। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ও মৃত্যুর মিছিল প্রবাসীদের মনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করত, বিশেষ করে ছোট শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা চরম উৎকণ্ঠায় থাকতেন। এখন জিপির (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) ব্যবস্থাপত্র নিয়ে সরাসরি এই টিকা গ্রহণের সুযোগ থাকায় সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই লাঘব হয়েছে।
টিকার সুরক্ষা ও কার্যকারিতা:
অস্ট্রেলিয়ার টিকাদান-সংক্রান্ত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চার বছর বা তার বেশি বয়সি যেকোনো ব্যক্তি এই টিকা নিতে পারবেন। শূন্য দশমিক ৫ মিলিলিটার পরিমাণের দুটি ডোজে টিকাটি সম্পন্ন হয়, যেখানে প্রথম ডোজ নেওয়ার অন্তত ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। অতীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন কিংবা কখনো আক্রান্ত হননি—উভয় পক্ষই এই টিকার আওতায় সুরক্ষাকবচ অর্জন করতে পারবেন। বিশেষ করে ডেঙ্গুপ্রবণ অঞ্চলে ভ্রমণকারী এবং অতীতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এই টিকা নেওয়ার জন্য জোরালো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও চিকিৎসা দৃষ্টিভঙ্গি:
রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্সের জনস্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞ ডা. পিটার মার্কির মতে, ডেঙ্গুর চারটি পৃথক ধরন বা স্ট্রেন রয়েছে। কোনো ব্যক্তি জীবনের কোনো এক সময়ে একটি ধরনে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্বিতীয়বার অন্য কোনো ভিন্ন ধরনে সংক্রমিত হলে তা অত্যন্ত মারাত্মক এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। তাই যেসব প্রবাসী বা ভ্রমণকারী একাধিকবার ডেঙ্গুপ্রবণ অঞ্চলে যাতায়াত করেন বা দীর্ঘমেয়াদে বসবাস করেন, তাদের জন্য এই টিকা গ্রহণ বাধ্যতামূলক সুরক্ষার মতো কাজ করবে।
ভ্রমণকারীদের ঝুঁকি ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট:
বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসাধীন শনাক্ত ডেঙ্গু রোগীদের প্রায় শতভাগই বিদেশভ্রমণ থেকে এই ভাইরাস শরীরে বহন করে ফেরেন। দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং ভারতের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘন ঘন ডেঙ্গু সংক্রমণের দেশগুলোতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রবাসী ও সাধারণ ভ্রমণকারীদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন দেশটির চিকিৎসকেরা।
অতীতে ২০১৫ সালে অনুমোদিত ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ টিকাটি কেবল পূর্বে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্যই সীমিত ছিল। এর বিপরীতে ‘কিউডেঙ্গা’ টিকাটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকায় এবং দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে সহজলভ্য হওয়ায় প্রবাসীদের ভ্রমণকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় এটি এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সান নিউজ / রাজীব