ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের তিন দিন পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে দিনরাত কাজ করছে উদ্ধারকারী দল। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৪৩০ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এখনো ৫১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যা দেশটির মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি
গত বুধবার রিখটার স্কেলে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প দেশটির বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চল। ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে এলাকাটিকে দুর্যোগপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার।
বহু ভবন ধসে পড়েছে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উদ্ধার কার্যক্রমও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জীবিত উদ্ধারের সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর জীবিত উদ্ধার অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টা প্রায় শেষের দিকে। ফলে ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা সময়ের সঙ্গে কমে আসছে।
সরকারি উদ্ধারকারী দলের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও নিজেদের উদ্যোগে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খোঁজ করছেন। অনেকেই ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়াই খালি হাতে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন।
যাতায়াতে নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ
উদ্ধার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে শুক্রবার রাত থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিশেষ অনুমতি ছাড়া লা গুয়াইরা অঞ্চলে প্রবেশ করা যাবে না। তবে অনুমতি প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গত এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি উদ্ধারকর্মীর সংখ্যা কম। যদিও সরকার দাবি করেছে, সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তৎপরতা
দেশটির জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিটি জীবিত উদ্ধার একটি অলৌকিক ঘটনার মতো। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও মানবিক সহায়তাকে স্বাগত জানিয়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই দুর্যোগে সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪.৭ থেকে ৮.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
আবারও অনুভূত হলো ভূকম্পন
উদ্ধার অভিযান চলাকালেই শনিবার আরাগুয়া রাজ্যে ৪.৮ মাত্রার আরেকটি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। যদিও এতে নতুন করে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি, তবে আতঙ্ক আরও বেড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ
সরকারি হিসাবের বাইরে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা জানিয়েছে, এখনো কয়েক হাজার মানুষের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৩০০ জন আহত হয়েছেন এবং ২৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
বাস্তুচ্যুত হতে পারেন লাখো মানুষ
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, রাজধানী কারাকাসসহ প্রায় ৬৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ এই ভূমিকম্পের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। সংস্থাটি আশঙ্কা করছে, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবেন।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো দ্রুত খাদ্য, চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমানো যায়।