দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলাকে আরও কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে নেওয়া অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প ‘ইনার বার ড্রেজিং’ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রকল্প সম্পন্ন হলে বন্দরের চ্যানেলে বড় আকারের বাণিজ্যিক জাহাজ সরাসরি প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রকল্প শেষ হলেও পশুর চ্যানেলের নাব্যতা টেকসইভাবে ধরে রাখা নিয়ে এখনো শঙ্কা রয়ে গেছে বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ী মহলে।
২৩ কিলোমিটার চ্যানেল খননে নতুন সক্ষমতা
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মোংলা বন্দরের হাড়বাড়িয়া এলাকা থেকে জেটি পর্যন্ত মোট ২৩ দশমিক ৪ কিলোমিটার চ্যানেল ড্রেজিং করা হয়েছে। এই কাজ সম্পন্ন হলে চ্যানেলের গভীরতা ৯.৫ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত উন্নীত হবে।
এর ফলে আগে যেখানে সর্বোচ্চ ৭ মিটার ড্রাফটের জাহাজ প্রবেশ করতে পারত, এখন থেকে ৯–১০ মিটার ড্রাফটের বড় কনটেইনার ও কার্গো জাহাজ সরাসরি বন্দরে ভিড়তে পারবে।
দীর্ঘ জটিলতা পেরিয়ে শেষের পথে প্রকল্প
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের মার্চে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি ২০২২ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে জমি অধিগ্রহণ, ডাম্পিং এলাকা জটিলতা এবং প্রাকৃতিক কারণে চ্যানেলে পুনরায় পলি জমে যাওয়ার ফলে প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত হয়।
প্রাথমিকভাবে ৭৯৩ কোটি টাকার প্রকল্পটি একাধিকবার সংশোধনের পর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯৯২ কোটি টাকায়।
আগামী মঙ্গলবার (৩০ জুন) প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বড় ঠিকাদারদের কাজ, পরে দেশীয়ভাবে সম্পন্ন
প্রকল্পের শুরুতে চীনের দুটি বড় প্রতিষ্ঠান—জিয়াংশু হাইহং কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনকে যৌথভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জটিলতার কারণে কাজটি দেশীয় ঠিকাদারদের মাধ্যমে শেষ করা হয়।
এর আগে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া আউটার বার ড্রেজিং প্রকল্প ২০২০ সালে সম্পন্ন হয়, যার ব্যয় ছিল ৭১২ কোটি টাকা।
নাব্যতা ধরে রাখা নিয়েই মূল উদ্বেগ
ড্রেজিং কাজ শেষের দিকে এলেও চ্যানেলে দ্রুত পলি জমে যাওয়ার প্রবণতা ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের মতে, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং না হলে চ্যানেল আবারও অগভীর হয়ে পড়বে।
এতে জাহাজগুলোকে মাঝনদীতে বা আউটার বারে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে, যা আমদানি-রপ্তানি খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং ব্যবসায়ীদের ওপর ডেমারেজ চাপ তৈরি করবে।
আন্তর্জাতিক বন্দর হিসেবে প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ
শিপিং এজেন্টদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের বন্দরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চ্যানেলের স্থায়ী গভীরতা বজায় রাখা।
নিয়মিত মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং না হলে বিদেশি শিপিং লাইনগুলো মোংলা বন্দরে আগ্রহ হারাতে পারে এবং ব্যবসা আবারও চট্টগ্রামমুখী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আশ্বাস
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন অর্থবছর থেকেই চ্যানেলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং শুরু করা হবে, যাতে পলি জমে আবারও নাব্যতা সংকট তৈরি না হয়।
কর্তৃপক্ষের মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে মোংলা বন্দর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে।
সান নিউজ/ কেএনআই