নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বলে সমালোচিত কয়েকজন শিক্ষকের অংশগ্রহণে আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলামের উপস্থিতিকে ঘিরে ক্যাম্পাসে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ ও কয়েকটি ছাত্রসংগঠন অভিযোগ করেছে, এ ধরনের উপস্থিতি বিতর্কিত শিক্ষক নেতাদের পুনর্বাসনের বার্তা দিতে পারে। তবে উপ-উপাচার্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি অনুষ্ঠানটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবগত ছিলেন না।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ জুন মাইজদী শহরের একটি টার্ফে নোবিপ্রবির একাংশ শিক্ষক এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে একটি প্রীতি ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও ফার্মেসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুল বারেক।
অনুষ্ঠানে অংশ নেন নীল দল ও স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের বিভিন্ন সময়ের পদধারী একাধিক শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাদশা মিয়া (সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, নীল দল), ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমান (স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের অন্যতম নেতা), পরিসংখ্যান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. ইফতেখার পারভেজ পুইয়ান (সাবেক কোষাধ্যক্ষ, নীল দল), অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মজনুর রহমান (সাবেক শিক্ষক সমিতির সদস্য), এমআইএস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুস সালাম (সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য, নীল দল), সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল মমিন সিদ্দিকী (সাবেক সহ-সভাপতি, নীল দল) এবং কৃষি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ নুরুজ্জামান (স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক)।
ঘটনাটি সামনে আসার পর ক্যাম্পাসে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অভিযোগকারীদের দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে সমালোচিত শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার একই অনুষ্ঠানে উপস্থিতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। তাঁদের ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক পুনর্বাসনের আশঙ্কা সৃষ্টি করছে।
জাতীয় ছাত্রশক্তি, নোবিপ্রবি শাখার আহ্বায়ক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা সাদা দলের শিক্ষকরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নীল দলের সদস্যদের সামনে আনার চেষ্টা করছেন কি না, সে প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। আপনারা একসময় আমাদের আন্দোলনের সঙ্গী ছিলেন। তাই এই ঘটনায় আমরা হতাশ।”
নোবিপ্রবি ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ হাসান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কোনো শিক্ষক কোথায় যাবেন, সেটি আমাদের বিষয় নয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আওয়ামী লীগ বা তাদের সহযোগী কোনো সংগঠন সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রদল তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। এর আগেও আমরা এ ধরনের অভিযোগে মানববন্ধন করেছি এবং প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি।”
ইসলামী ছাত্রশিবিরের নোবিপ্রবি শাখার সভাপতি আরিফুর রহমান সৈকত বলেন, “বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে না। প্রশাসনের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করছি।”
তবে অভিযোগ নাকচ করে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “খেলাটি সম্পর্কে বিস্তারিত আমি জানতাম না। আমার সহকর্মী অধ্যাপক আব্দুল মমিন সিদ্দিকী আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী আমি সেখানে গিয়ে পুরস্কার বিতরণ করি। উপস্থিত হওয়ার পর জানতে পারি এটি শহরে অবস্থানকারী শিক্ষক ও আবুল খায়ের গ্রুপের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি খেলা। সেখানে আর কারা ছিলেন, সে বিষয়েও আগে আমার জানা ছিল না।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের আক্ষেপের জায়গাটি আমি বুঝতে পেরেছি। আমি কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা করছি না। প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক আলাদা বিষয়। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে হয়। আমি আমার আদর্শে স্থির আছি এবং থাকব।”
উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ক্যাম্পাসে পরিচিত। সম্প্রতি তিনি নোবিপ্রবির উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই অনুষ্ঠানে উপস্থিতি নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সান নিউজ/ জামান