বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ নিউজিল্যান্ডের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থায় এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঘনঘটা দেখা দিয়েছে। দেশটির বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব ইতোমধ্যে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সাম্প্রতিক এক সরকারি জলবায়ু প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, এই বিপজ্জনক প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশটিতে তাপপ্রবাহ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে এবং ঐতিহাসিক হিমবাহগুলো দ্রুত গলে গিয়ে স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়বে।
বিশ শতকের শুরু অর্থাৎ ১৯০৯ সাল থেকে দেশটিতে আবহাওয়ার তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ১.৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, আবহাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাসে যে দশটি বছরকে সবচেয়ে উষ্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে সাতটি বছরই পার হয়েছে কেবল গত এক দশকের ব্যবধানে। তাপমাত্রা লাগাতার বেড়ে যাওয়ার সরাসরি কুফল হিসেবে দেশটির বিখ্যাত প্রায় তিন হাজার হিমবাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হতে শুরু করেছে। ১৯৯৭ সালে এসব হিমবাহের সম্মিলিত আয়তন ছিল ৫৬ ঘনকিলোমিটারের কাছাকাছি, যা নাটকীয়ভাবে কমে ২০২৩ সালে মাত্র ৩০ ঘনকিলোমিটারে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের করা বিভিন্ন জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, চলতি শতাব্দীর শেষ অর্থাৎ ২১০০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হলেও নিউজিল্যান্ডের অবশিষ্ট হিমবাহগুলোর আয়তন ১৪ থেকে ৮৬ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। আর যদি বর্তমানের উচ্চ নিঃসরণ হার অব্যাহত থাকে, তবে দেশটির প্রায় শতভাগ হিমবাহ বা সম্পূর্ণ আইস কভার চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
বায়ুমণ্ডলের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১৯৭২ সালে যখন গ্রিনহাউস গ্যাসের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছিল, তখন থেকে এ পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিগত বছরগুলোতে মিথেনের ঘনত্বও বেড়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতা স্পর্শ করেছে। পরিবেশ বিষয়ক প্রধান বিজ্ঞান উপদেষ্টারা জানাচ্ছেন যে, বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতা বৃদ্ধির এই সত্যতা এখন কোনো তাত্ত্বিক অনুমান নয়, বরং একাধিক দৃশ্যমান সূচকের মাধ্যমে তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের আবহাওয়া, সমুদ্রের গতিপ্রকৃতি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, নিউজিল্যান্ডের উপকূলবর্তী ও আশপাশের সমুদ্রের তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড় বৃদ্ধির হারের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রের অস্বাভাবিক এই উষ্ণায়নের ফলে সামুদ্রিক স্পঞ্জ ব্যাপকভাবে বিবর্ণ হয়ে মারা যাচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় বুল কেল্প নষ্ট হচ্ছে, প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক মাছ উপকূলে ভেসে আসছে এবং পেঙ্গুইনের মতো সংবেদনশীল প্রাণীর মৃত্যুর হারও উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে।
আগামী দশকগুলোতে দেশবাসীকে আরও তীব্র তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০৫০ সালের মধ্যে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা সাধারণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে শক্তিশালী প্রলয়ঙ্করী ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে।
অতীতে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো থেকে এর ভয়াবহতা আঁচ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী সাইক্লোন গ্যাব্রিয়েল এবং রাজধানী অকল্যান্ডের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কথা বলা যায়। সে সময় আকস্মিক প্রাকৃতিক তাণ্ডবে যেমন ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তেমনি তা পুরো দেশের অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদী ও গভীর সংকট তৈরি করেছিল। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল প্রকৃতি বা জীববৈচিত্র্যের সংকট নয়; এটি মানবজীবন, জনস্বাস্থ্য এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির সুরক্ষার জন্য এক নম্বর হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সান নিউজ / রাজীব