বঙ্গোপসাগর পাড়ে সুন্দরবনের দুবলার চরে ৩০ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে শুটকি মৌসুম। এ মৌসুমকে ঘিরে মোংলার উপকূলের নদ-নদীতে জড়ো হয়েছে কয়েক হাজার জেলে ও ট্রলার। বনবিভাগের কাছ থেকে পাস-পারমিট নিয়ে বৃহস্পতিবার দিবাগর রাত ১২টার পর থেকে সমুদ্রে যাত্রা করবেন জেলেরা।
আবার কেউ রওনা হবেন শুক্রবার ভোরে। গত দুই-তিন ধরে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জেলেরা মোংলায় অবস্থান নিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ট্রলার ভর্তি করছেন।
বনবিভাগ জানায়, প্রতি বছরের মত এবারও ৩০ অক্টোবর থেকে দুবলার চরে শুরু হচ্ছে ৫ মাসের শুটকি মৌসুম। এ শুটকি মৌসুম শেষ হবে আগামী বছরের মার্চ মাসের শেষে। মৌসুমের ৫ মাস ধরে তারা দুবলার আলোরকোল, অফিসকেল্লা, নারকেলবাড়ীয়া ও শেলার চরে অবস্থান করবেন। চরগুলোতে জেলেদের থাকার জন্য ৯শ টি ঘর বাঁধার অনুমতি দিয়েছি বনবিভাগ। আর দোকানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে ১০০টি। এরমধ্যে রয়েছে মুদি, তেল, ওষুধ, সেলুন ও হোটেলসহ নানা পণ্যের দোকান। এছাড়া মাছ বেচা-কেনার জন্য ১০০টি ডিপোর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ মৌসুমকে ঘিরে চরগুলোতে প্রায় ১০ হাজার জেলে-মহাজনের সমাগম ঘটবে। তারা চরে থাকার জন্য অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করবেন। নির্মাণ করবেন মাছ শুকানোর চাতাল ও ট্রলার থেকে মাছ ওঠা-নামানোর জন্য জেটি এবং ঘাট। এসব কাজে জেলেরা কোনভাবেই সুন্দরবনের কোন প্রজাতির গাছপালা কাটতে ও ব্যবহার করতে পারবেন না। কেউ যদি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বনের ক্ষতিসাধনের অপচেষ্টা চালান তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিবে বনবিভাগ। এ নিষেধাজ্ঞা মেনেই চরে ঘর তোলাসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে জেলেরা প্রয়োজনীয় কাটপাট সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন।
দুবলার উদ্দেশ্যে মোংলায় আসা জেলেরা বলেন, যে সময়টা ধরে দুবলার চরে থাকি, এই সময়টাই ঝড় জ্বলোচ্ছাসের সময়। ঝড় জ্বলোচ্ছাসের কারণে আমাদের মাছ ধরা ও শুকানোর কাজে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। ঝড়ে অনেক সময় ট্রলার ডুবে যায়। বৃষ্টিতে চরের মাছও পঁচে যায়। এতে আমাদের ভীষণ ক্ষতি হয়। তাই ঝড় জ্বলোচ্ছাসের সাথে যুদ্ধ করেই আমাদের বেঁচে থাকতে হয়।
তারা আরো বলেন, বনের গাছপালা কাটা ও ব্যবহার নিষেধ। তাই আমরা জাল ধরার জন্য কাঁকড়া, ঘর ও চাতাল নির্মাণের বাঁশ, বেড়া-চাটকি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি। আমরা বনের কোন ক্ষতি করবো না।জেলেরা আরো বলেন, গত বছর সাগরে ও চরে দস্যুদের উৎপাত ছিল। আমাদের অনেক জেলেকে তুলে নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করেছিলো। এবারও দস্যুদের উৎপাত রয়েছে। এবার গিয়ে ভাগ্যে কি ঘটে জানিনা। আমরা প্রশাসনের কাছে দাবী জানাই আমাদেরকে যেন নিরাপত্তা দেয়া হয় এবং দস্যুদের নির্মুল করা হয়।
এদিকে এবারই প্রথম দুবলার চরের জেলেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফ্রেন্ডশিপ'র ভাসমান হাসপাতাল ও রোগীদের জন্য আনানেওয়ার জন্য একটি স্প্রিড বোটও থাকছে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, জেলেদের চিকিৎসার কথা চিন্তা করেই এবারই প্রথমবারে ফ্রেন্ডশিপের ভাসমান হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ৫ মাস ধরেই ফ্রেন্ডশিপ সেখানে চিকিৎসা সেবা দিবেন। তিনি আরো বলেন, দস্যুতা নির্মুলে কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে সুন্দরবন জুড়ে পৃথক দুইটি অভিযান চালানো হচ্ছে। এতে দস্যুতা আগের চেয়ে অনেকাংশে কমে এসেছে। আমরা যেভাবেই হোক সুন্দরবনকে দস্যু মুক্ত করে জেলেদের নির্বিঘ্ন চলাফেরার ব্যবস্থা করবো।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, গত শুটকি মৌসুমে বনবিভাগের সাড়ে ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। কিন্তু এবারের চ্যালেন্জ হলো দস্যুতার। দস্যুতার কারণে গতবারও রাজস্ব তুলনামূলক কম হয়েছে। এবারও সেই আশংকা রয়েছে। তারপরও এবার ৮ কোটি টাকা টার্গেট ধরা হয়েছে। এছাড়া দস্যুরা জেলেদেরকে ধরে নিয়ে মুক্তিপণ আদায় করায় জেলে ও মহাজনেরা আর্থিক ক্ষতিতে পড়েন। এবং জেলেদের মাঝে দস্যু আতংক থাকে। তাই এবার কোস্ট গার্ডকে রাতে বেলায়ও টহল জোরদারের জন্য আমরা জানিয়েছি।
সাননিউজ/বান্না