ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মোঃ শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এমপি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পানি ব্যবস্থাপনাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও জলবায়ু সহনশীল করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, সম্মিলিত উদ্যোগ ও বিভিন্ন পক্ষের অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশের মানুষের জন্য নিরাপদ, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট ২০২৬) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে পরিকল্পনা কমিশন আয়োজিত এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো বাস্তবায়নের পথনির্দেশনা বিষয়ক জাতীয় সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
সম্মেলনের অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘ন্যায়সঙ্গত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং এসডিজির ৩, ৫, ৬ ও ১০ নম্বর লক্ষ্য অর্জন’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে নানা ধরনের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলা করছে। এর প্রভাব সরাসরি দেশের পানি ব্যবস্থাপনার ওপর পড়ছে।
বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, খরা, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার মতো সমস্যা ক্রমেই পানি সম্পদের ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানি সম্পদের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
পানিসম্পদমন্ত্রী জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবিকার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এই অঞ্চলের মানুষের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পাশাপাশি কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পদ্মা ব্যারেজকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে সরকার।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রসঙ্গেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন পানিসম্পদমন্ত্রী। বিশেষজ্ঞদের মতামত পাওয়ার পর দ্রুত এ বিষয়ে অনুমোদনের দিকে এগোনো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিস্তা নদীকেন্দ্রিক পানি ব্যবস্থাপনা, নদী ও পরিবেশ সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। তাই বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনাটি এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় সম্মেলনের সেমিনারে পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ন্যায়সঙ্গত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
পানিসম্পদ মন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে আসে এসডিজির ৬ নম্বর লক্ষ্য—নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করার বিষয়টি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য পানি ব্যবস্থাপনায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও গুরুত্ব পায়।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান। গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য আনা মিঞ্জ।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পরিচালক পার্থ হেফাজ শেখ, নারীপক্ষের পরিচালক অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অফিসার সাইফুর রহমান।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা পানি, জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যত বাড়ছে, নিরাপদ পানি ও পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তাও তত বাড়ছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় বাস্তুচ্যুতি, বন্যা ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থায় সরকারের ঘোষিত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনার মতো বড় উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে পানি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা গেলে ভবিষ্যতে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও সক্ষম হবে—এমন প্রত্যাশাই উঠে এসেছে জাতীয় সম্মেলনের আলোচনায়।