রাজধানীর একটি নামী ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে পাশের দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লেন। তাঁর হাতে থাকা এক হাজার টাকার নোটটি নিতে বিক্রেতা সাফ মানা করে দিলেন। কারণ, নোটটির এক কোণ ছেঁড়া এবং মাঝখানে স্কচটেপ লাগানো। বুথ থেকে বের হওয়া টাকা যে অচল হতে পারে, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে ভাবা কঠিন। কিন্তু এটাই এখন দেশের নিত্যদিনের বাস্তব চিত্র। বাজারে এখন শুধু ছেঁড়া-ফাটা বা তেলচিটে নোংরা নোটের ছড়াছড়িই নয়, বরং উচ্চমূল্যের জাল নোটের উপদ্রবও আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কাগজের টাকার এই জঞ্জাল থেকে রেহাই পেতে দেশের মানুষ যখন ডিজিটাল বা ক্যাশলেস লেনদেনের দিকে ঝুঁকতে চাইছে, তখন সেখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অতিরিক্ত সেবামূল্য বা ট্রানজেকশন চার্জ বা সার্ভিস চার্জ।
বর্তমানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাগজের টাকা ব্যবহার করা এক ধরণের মানসিক যন্ত্রণায় পরিণত হয়েছে। দশ, বিশ, পঞ্চাশ, একশ টাকার নোটগুলো হাতবদল হতে হতে এতটাই নোংরা ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে যে, সেগুলো পকেটে রাখাই অস্বস্তিকর। তার চেয়েও বড় সংকট হলো জাল নোটের বিস্তার। নিখুঁতভাবে তৈরি হওয়া এসব জাল টাকা সাধারণ মানুষের পক্ষে চেনা প্রায় অসম্ভব। ফলে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, কাগজের মুদ্রাভিত্তিক এই সনাতন লেনদেন ব্যবস্থা সাধারণ নাগরিককে প্রতিনিয়ত আর্থিক ক্ষতি ও প্রতারণার ঝুঁকিতে ফেলছে।
এই সমস্যার সমাধান কিন্তু আমাদের খুব কাছেই রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকালে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। সেখানকার একদম প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম, ফুটপাতের চা-বিক্রেতা কিংবা সবজিওয়ালাও এখন কাগজের টাকা স্পর্শ করেন না। তাঁরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরকারি ‘ইউপিআই’ প্রযুক্তির মাধ্যমে কিউআর কোড স্ক্যান করে ডিজিটাল পেমেন্ট নিচ্ছেন। এক রুপি থেকে শুরু করে যেকোনো অঙ্কের লেনদেন সেখানে একদম 'শূণ্য খরচে' করা সম্ভব হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে বিকাশ বা নগদের মতো মোবাইল ব্যাংকিং সেবাগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে গেলেও তা সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি সাশ্রয়ী হতে পারেনি। এখানে একজন গ্রাহককে এক হাজার টাকা ক্যাশ-আউট করতে সর্বনিম্ন ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুণতে হয়। এমনকি এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে গেলেও ফি দিতে হচ্ছে। একজন নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এই সামান্য চার্জও অনেক বড় বোঝা। ফলে সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত খরচের ভয়ে মানুষ বাধ্য হয়ে কাগজের নোংরা ও ঝুঁকিপূর্ণ টাকা পকেটে নিয়ে ঘুরছেন।
বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থে ক্যাশলেস বা ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হয়, তবে এই লেনদেন প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি নিখরচায় রূপ দিতে হবে। ডিজিটাল লেনদেন ফ্রি করা হলে সরকারের নিজস্ব বড় অঙ্কের সাশ্রয় হবে। কারণ, ছেঁড়া-ফাটা ও পুরোনো নোট বাজার থেকে তুলে নিয়ে নতুন নোট ছাপাতে প্রতি বছর বাংলাদেশ ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা ব্যয় হয়। লেনদেন পুরোপুরি ডিজিটাল হলে এই বিপুল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় বন্ধ হবে। একই সাথে, প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড থাকার কারণে জাল নোটের কারবার এক ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যাবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে ইতোমধ্যে 'বাংলা কিউআর' ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এখন প্রয়োজন এর আওতা বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য একে সম্পূর্ণ ফ্রি বা চার্জমুক্ত ঘোষণা করা। প্রয়োজনে মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার থেকে নীতিগত ছাড় বা বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে হলেও সাধারণ গ্রাহকের জন্য মার্চেন্ট পেমেন্ট এবং পার্সন-টু-পার্সন লেনদেনের খরচ শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ডিজিটাল লেনদেন এখন আর কোনো বিলাসিতা বা আধুনিকতার অনুষঙ্গ নয়; এটি নাগরিক স্বস্তি, জাল নোটের অভিশাপ থেকে মুক্তি এবং একটি পরিচ্ছন্ন অর্থনীতি গড়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কাগজের মুদ্রার ভোগান্তি থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে এবং স্মার্ট অর্থনীতি বিনির্মাণে ক্যাশলেস লেনদেনকে সম্পূর্ণ ফ্রি করার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সান নিউজ/ জামান