দেশের দরিদ্র, প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে লক্ষ্য করে একটি সমন্বিত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রণীত এই নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারকে উন্নয়ন সহায়তার মূল একক হিসেবে বিবেচনা করা।
নীতিমালাটি সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে জনমত ও পরামর্শ গ্রহণ করা হচ্ছে। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী একটি সমতাভিত্তিক ও মানবিক সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, প্রতিটি উপকারভোগী পরিবারের জন্য একটি অনন্য পরিচিতি নম্বর বা ‘ওয়ান আইডি’ প্রদান করা হবে। এই আইডি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ ডেটা মডেলের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকবে, যাতে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মাধ্যমে দ্বৈত সুবিধা গ্রহণ বন্ধ করা যায়। কার্ডটি ইস্যু করা হবে পরিবারের মা বা জ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের নামে, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হয়।
সঠিক উপকারভোগী শনাক্তে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি ‘প্রক্সি মিন্স টেস্ট’ নামের বৈজ্ঞানিক স্কোরিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এই স্কোরের ভিত্তিতে জনগণকে বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্তরে ভাগ করা হবে এবং অতি দরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দুর্গম হাওর, উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলের জন্য থাকবে অতিরিক্ত অগ্রাধিকার পয়েন্ট।
প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড হবে আধুনিক স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর একটি ডুয়াল ইন্টারফেস (NFC ও চিপভিত্তিক) কার্ড। এতে ‘টাকা পে’ অ্যাপলেটের মাধ্যমে এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলনের সুবিধা থাকবে। পাশাপাশি ‘ই-আইডি’ সিস্টেমে পরিবারের তথ্য, ছবি ও একাধিক ডেটা সংরক্ষিত থাকবে, যা অফলাইনেও যাচাই করা সম্ভব হবে। কিউআর কোড স্ক্যানের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে কার্ড যাচাই করতে পারবেন।
এই কর্মসূচিতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই আইবাস++ পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টে অর্থ প্রেরণ করা হবে।
নীতিমালায় একটি ‘নেগেটিভ লিস্ট’ও নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো পরিবারের সদস্য যদি সরকারি চাকরিজীবী হন, নিয়মিত পেনশনভোগী হন, পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র থাকে, চার চাকার গাড়ির মালিক হন, নিয়মিত করদাতা হন অথবা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি জমির মালিক হন, তবে সেই পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে না।
অভিযোগ ও জালিয়াতি রোধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী ডিজিটাল পরিবার জরিপ পরিচালনা করা হবে, যেখানে গণনাকারীরা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং জিও-ট্যাগিং ও ছবি সংরক্ষণ করবেন।
নীতিমালা বাস্তবায়নে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটি, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তদারকি কমিটি এবং মাঠপর্যায়ে একাধিক প্রশাসনিক কমিটি কাজ করবে। পার্বত্য অঞ্চলে স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বকেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, প্রতি ছয় মাসে ডিজিটাল যাচাইয়ের মাধ্যমে উপকারভোগীদের তালিকা হালনাগাদ করা হবে। যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠবেন, তাদের কর্মসূচি থেকে ধাপে ধাপে বাদ দেওয়া হবে এবং নতুন যোগ্য পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সরকারি গেজেট প্রকাশের পর এই নীতিমালা সারাদেশে কার্যকর হবে বলে খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।