ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজধানী দিল্লিতে চরম নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন দিল্লিতে প্রায় ২৩ হাজার কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি নজিরবিহীন পদক্ষেপে বন্ধ রাখা হয়েছে বহু মেট্রো স্টেশন এবং বাতিল করা হয়েছে অর্ধশতের বেশি দূরপাল্লার ট্রেন।
আগামীকাল শনিবার দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে এই বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে সিজেপি। নির্বাচন কমিশনের চলমান ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করছে দলটি। তবে দিল্লি পুলিশ এই বিক্ষোভের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়নি। কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, নিয়মানুযায়ী যেকোনো বড় কর্মসূচির জন্য অন্তত ১০ দিন আগে নোটিশ দেওয়ার বিধান থাকলেও সিজেপি মাত্র তিন দিন আগে অর্থাৎ গত ৭ অক্টোবর অনুমতির জন্য আবেদন করেছে।
দিল্লি পুলিশ আরও জানিয়েছে, এর আগে একই সংগঠনের আয়োজিত একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সরকারি নির্দেশিকা ও শর্তাদি লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট রেকর্ড রয়েছে। সার্বিক জননিরাপত্তা, জনজীবন স্বাভাবিক রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধের কথা বিবেচনা করেই এবার সমাবেশ করার অনুমতি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এই নির্দেশ অমান্য করে কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে পুলিশ প্রশাসন।
উত্তপ্ত পরিস্থিতি কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে ইতিমধ্যেই যন্তর মন্তরসহ দিল্লির সংবেদনশীল ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা (যা ১৪৪ ধারা হিসেবে পরিচিত) জারি করা হয়েছে। সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের নাশকতা বা সহিংসতা রোধে পুলিশি নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে পুরো এলাকা। নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে, বাড়ানো হয়েছে ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার নজরদারি এবং বিক্ষোভকারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী রাজ্য উত্তর প্রদেশ ও হরিয়ানার পুলিশ প্রশাসনকেও সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।
বিক্ষোভের এই তীব্র প্রভাব সরাসরি পড়েছে দিল্লির জনজীবন ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর। দিল্লি পুলিশের বিশেষ অনুরোধে আজ শুক্রবার রাত নয়টা থেকে দিল্লির মোট ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বহির্গমন পথ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত এই কড়াকড়ি বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
বন্ধ থাকা গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোর তালিকায় রয়েছে রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, নয়াদিল্লি, প্যাটেল চক, জনপথ, মান্ডি হাউস, আইটিও, দিল্লি গেট, খান মার্কেট, কাশ্মীরি গেট, হাউজ খাস এবং লাজপত নগরের মতো ব্যস্ততম ট্রানজিট হাবগুলো। এগুলো দিল্লির মূল যোগাযোগকেন্দ্র হওয়ায় আকস্মিক এই পদক্ষেপে রাজধানীজুড়ে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
মেট্রো চলাচলে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বিঘ্নিত হচ্ছে রেল যোগাযোগও। শুক্র ও শনিবার নয়াদিল্লি এবং হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন মোট ৬১টি দূরপাল্লার ট্রেন সম্পূর্ণ বাতিল করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে শুক্রবার ৪০টি এবং শনিবারের ২১টি ট্রেন তাদের নিজ নিজ সূচনাস্থল থেকেই যাত্রা বাতিল করেছে। এর ফলে বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা ও যাওয়া যাত্রীরা বড় ধরনের বিপাকে পড়েছেন। রেলওয়ের পক্ষ থেকে যাত্রীদের স্টেশনে রওনা দেওয়ার আগে ট্রেনের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে নেওয়ার বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সান নিউজ / রাজীব