মতামত

কবি ফরিদা মজিদকে যেমন দেখেছি

মাহমুদা আকতার: আমি তখন বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে রয়েছি, পাঠ নিচ্ছি লেখালেখির নানা বিষয়ে। দেশের স্বনামধন্য কবি, লেখক ও নাট্যব্যক্তিত্বরা আমাদের প্রশিক্ষণ ক্লাসে আসেন রিসোর্স পার্সন হিসাবে। তারা তাদের লেখালেখির কৌশল আর নানা অভিজ্ঞতার কথা বয়ান করেন। আমরা সেগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনি। কোনও কোনও নবীন কবি বা লেখক যে দু একটা বেয়ারা প্রশ্ন করেন না, এমন নয়। এসব প্রশ্ন শুনে তাদের কেউ কেউ বিরক্ত হন, কেউ বা বিরক্তি চেপে রেখে চতুরতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলে নেন। আমাদের ক্লাস চলে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। শুক্রবার বন্ধ।

তো একদিন বিকেলের সেশনে কবি মুহম্মদ নূরল হুদার সঙ্গে ক্লাসে প্রবেশ করলেন একজন সুন্দরী তরুণী। পরে জেনেছি তার বয়স তখন ৫০য়ের কোঠায়। অথচ দিব্যি ভার্সিটিতে পড়ুয়া তরুণী বলে চালিয়ে দেয়া যায় তাকে। এতটাই ছিমছাম আর মিষ্টি দেখতে ছিলেন ওই নারী। হুদা ভাই আমাদের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি প্রবাসী কবি ফরিদা মজিদ, ভালো অনুবাদ করেন, একই সঙ্গে সুন্দর আবৃত্তি করেন। তিনি আমাদের স্বরচিত কিছু কবিতা পাঠ করে শোনালেন। একটা ইংরেজি কবিতাও শুনিয়েছিলেন বোধহয়। কী মিষ্টি কণ্ঠ আর অপূর্ব সুন্দর তার উচ্চারণ! আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সেশন শেষে তার কাছে গেলাম। বললাম- ‘আপু, আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি আপনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই।’

তিনি সানন্দে রাজি হলেন এবং আমাকে তার ফোন নাম্বার ও বাড়ির ঠিকানা লিখে দিলেন।

তিনি উঠেছেন তার নানা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি গোলাম মোস্তফার বাড়িতে। তিনি কবির বড় মেয়ে জোছনার কন্যা। একদিন সকালে তার দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী হাজির হলাম তার আবাসস্থল মালিবাগ-মৌচাকের বাড়িতে। একতলা ছিমছাম বাড়ি। লোহার গেট খুলে ভিতরে প্রবেশ করলাম। এক চিলতে বাগান পেরিয়ে ঘরে ঢুকলাম। কোনও সাজানো গুছানো ড্রয়িংরুমে নয়, তিনি আমাকে বসালেন নিজের বেডরুমে। তিনি বসে আছেন বিছানাতে, আমি পাশের চেয়ারে। আমরা কথা বলছি নানা বিষয়ে। আসলে তিনিই বলছেন বেশি, আমি শ্রোতার ভূমিকায়। মাঝে মাঝে কিছু প্রশ্ন করছি। আর তাকে দেখছি। কী সুন্দর পরিপাটি করে রেখেছেন নিজেকে, এই সকাল বেলাতেও। তার প্রকৃত বয়স তো অনুমান করার কোনও উপায় নেই। তার মধ্যে একটা শিশুসুলভ ব্যাপার আছে যা তাকে সবসময় সতেজ করে রেখেছে। এ কারণেই তার কাছে বয়স একটা সংখ্যা মাত্র, বার্ধক্য তাকে ছুঁতে পারেনি।

তিনি বলছেন, তার শৈশব, কৈশোর, লেখালেখি, বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে। কবি গোলাম মোস্তফাকে নিয়েও স্মৃতিচারণ করলেন। নানার কোলে উঠে তারই কবিতা আবৃতি করে শুনিয়েছেন তাকে। নাতনির কবিতা শুনে কত যে খুশি হতেন কবি গোলাম মোস্তফা!

তখন তিনি নিউ ইয়র্কে বসবাস করছেন। এর আগে ছিলেন তিনি প্রথমে লন্ডনে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি লন্ডনে বসে দেশের বড় বড় কবি-সাহিত্যিকদের লেখা অনুবাদ, সম্পাদনা ও প্রকাশনার কাজ করেন। তিনি নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেন ১৯৮৪ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত। ১৯৯১ থেকে এক দশকেরও ইংরেজির লেকচারার হিসেবে কর্মরত ছিলেন নিউইয়র্কের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে বিভিন্ন মার্কিন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন ফরিদা মজিদ।

এক পর্যায়ে আলাপে ছেদ পড়লো। অন্দর মহল থেকে নারী কণ্ঠের উচ্চ বাক বিতণ্ডা শুনতে পাচ্ছিলাম। খানিকটা বিরক্ত মনে হচ্ছিলো কবিকে। ‘ -একটু বস, আসছি’। বলে তিনি ওঠে গেলেন। আমি জানালা দিয়ে বাগানের শোভা দেখছি। কী সুন্দর রক্তজবা ফুটে আছে! একটু পর থেমে গেল বাক বিতণ্ডা। ফিরলেন ফরিদা মজিদ, তাকে কিছুটা বিপর্যস্ত লাগছিলো। তবে দ্রুত স্বাভাবিকতায় ফিরলেন। তিনি বলছেন, আমি লিখছি। এক সময় শেষ হলো আলাপচারিতা। বিদায় নিয়ে ওঠে দাঁড়ালাম। তিনি আসলেন আমার সাথে। বাগান ছাড়িয়ে প্রধান ফটক অব্দি এগিয়ে দিলেন। শুভকামনা জানিয়ে ওঠে এলাম বড় রাস্তায়। আসতে আসতে মনে হচ্ছিলো- আচ্ছা, উনি এত সুন্দর খোপা বাঁধেন কি করে! জানতে না চাওয়ায় আফসোস হচ্ছিলো খুব।

প্রখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে কবি ফরিদা মজিদ

আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার বেশ কয়েক বছর পর তিনি পাকাপাকিভাবি দেশে ফিরে আসেন। ঢাকায় তিনি নানা গোলাম মোস্তফার ওই বাড়িতেই একাকী বসবাস করতেন। আমৃত্যু তিনি এখানেই ছিলেন। গত মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ভোর ৫টায় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৯ বছর বয়সে মারা যান তারুণ্যের কবি ফরিদা মজিদ। কবি গোলাম মোস্তফার সান্নিধ্যেই তার কবি সত্ত্বা গড়ে উঠেছিলো। কবিতা লেখার পাশাপাশি অনুবাদ করতেন, একসময় বিটিভিতে নিয়মিত কবিতা আবৃত্তি করতেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হলেও সারাজীবনে তার একটিমাত্র কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। হয়তো ‘গাঁদা ফুলের প্রয়াণ ও যারা বেঁচে থাকবে’কাব্যগ্রন্থটি দিয়েই আমাদের সাহিত্য জগতে অমর হয়ে থাকবেন এই কবি।

সান নিউজ/এনএএম

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

১৯২৭ -২০২৭: গৌরীপুর পৌরসভা

ব্রিটিশ আমলে ১৯২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ময...

মুন্সীগঞ্জ সদরে ৫০০ ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

মুন্সীগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ মো. দেল...

মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য আসছে ‘১০০-তে ১০০’ কর্মসূচি

আগামীকাল থেকে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে ‘১০০-তে ১০০’ কর...

মাটিরাঙায় বিনামূল্যে স্তন ও জরায়ুর মুখ ক্যানসারের পরীক্ষা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত 

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় অসহায় নিম্মবিত্ত মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দি...

মাটিরাঙায় বিনামূল্যে স্তন ও জরায়ুর মুখ ক্যানসারের পরীক্ষা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত 

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় অসহায় নিম্মবিত্ত মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দি...

মুন্সীগঞ্জ সদরে ৫০০ ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

মুন্সীগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ মো. দেল...

মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য আসছে ‘১০০-তে ১০০’ কর্মসূচি

আগামীকাল থেকে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে ‘১০০-তে ১০০’ কর...

১৯২৭ -২০২৭: গৌরীপুর পৌরসভা

ব্রিটিশ আমলে ১৯২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ময...

ভালুকায় দেশীয় মাছ রক্ষায় বিশেষ অভিযান: বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ ও ধ্বংস

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নে দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় পরিচালিত...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা