ফিচার
জমিদারির এক শতবর্ষী শহরের গল্প

১৯২৭ -২০২৭: গৌরীপুর পৌরসভা

মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার,

ব্রিটিশ আমলে ১৯২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌরসভা তার বর্ণাঢ্য ইতিহাসের প্রায় এক শতাব্দী পূর্ণ করতে চলেছে। ময়মনসিংহ জেলার অন্যতম প্রাচীন ও 'ক' শ্রেণির এই পৌরসভাটি কেবল একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং উত্তর-পূর্ব বাংলার জমিদারী ঐতিহ্য, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। ঐতিহাসিক দলিল ও সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৭৮ সালে মুক্তাগাছা পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর গৌরীপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত ১২টি জমিদারবাড়ির মধ্যে গৌরীপুর রাজবাড়ি এস্টেটের উদ্যোগেই প্রথম এখানে একটি পৌরসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে এই প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ, ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি গৌরীপুর এস্টেটের নামানুসারে আনুষ্ঠানিকভাবে গৌরীপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৮ সালে মুক্তাগাছা পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর—অথবা তারও আগে—রামগোপালপুর, ভবানীপুর, গোলকপুর, কালীপুর, কৃষ্ণপুর, বোকাইনগর কিংবা ভালুকা এস্টেটের মতো গৌরীপুর উপজেলার অন্যান্য জমিদাররা পৃথক পৌরসভা গঠনের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিলেও তা শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে ব্যর্থ হয়েছিল। মূলত গৌরীপুর অঞ্চলে বিভিন্ন জমিদারদের ভিন্ন ভিন্ন নামে এস্টেট থাকায় তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও অনৈক্যের কারণেই সেই উদ্যোগগুলো ভেস্তে গিয়েছিল।

পরবর্তীতে মোমেনসিং পরগণার গৌরীপুর এস্টেটের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী এই জমিদারবাড়ির আশপাশে একটি পৌরসভা স্থাপনের প্রস্তাব করেন। অন্যান্য এস্টেটের জমিদাররা এতে তীব্র আপত্তি জানালেও তৎকালীন ইংরেজ শাসকরা শেষ পর্যন্ত গৌরীপুর এস্টেট এলাকাতেই 'গৌরীপুর পৌরসভা' পত্তন করেন। স্বাভাবিকভাবেই, গৌরীপুর এস্টেটের নামানুসারেই এই পৌরসভার নাম রাখা হয় 'গৌরীপুর পৌরসভা' এবং বর্তমান পৌরসভার ভিতরে ৮টি জমিদারবাড়ির এলাকা নিয়ে সমগ্র অঞ্চলটি পরিচিত লাভ করে 'গৌরীপুর টাউন' হিসেবে। তবে ইতিহাসের ধারা বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু সম্ভাব্য কারণ সামনে আসে, যার ফলে গৌরীপুরে পৌরসভা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াটি অপেক্ষাকৃত দেরিতে (১৯২৭ সালে) সম্পন্ন হয়েছিল।

এক সময়ে বালুয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠেছিল শতবর্ষী গৌরীপুর পৌরসভাঃ

১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত গৌরীপুর পৌরসভা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পৌরসভাগুলোর একটি। আশির দশক পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলায় যে মাত্র তিনটি পৌরসভা ছিল, গৌরীপুর পৌরসভা ছিল তাদের মধ্যে একটি। শতবর্ষের এই পৌরসভার বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এককালের খরস্রোতা বালুয়া নদী। ঐতিহাসিক সূত্র ও প্রাচীন মানচিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, নদীটি গৌরীপুর নগরাঞ্চলের ভূপ্রকৃতি, জনবসতি, বাণিজ্য এবং জমিদারি প্রশাসনের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সময়ের পরিক্রমায় এবং প্রকৃতির টানে সেই বালুয়া নদীর স্রোত আজ হারিয়ে গেছে; বর্তমানে যার স্মৃতি বহন করছে কিছু বিচ্ছিন্ন খাল, বিল আর নিচু ভূমি। নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা থেকে আধুনিক নগরে রূপান্তরিত হওয়ার এই দীর্ঘ পথপরিক্রমা গৌরীপুরের ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। এক সময়ে বালুয়া নদী দুটি শাখায় বিভক্ত ছিল। এর একটি শাখা গৌরীপুর এস্টেট এবং কালীপুর এস্টেটের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাটবাজার ও মাঝিপাড়া ঘেঁষে পূর্বদিকে ভালকি নদীর সঙ্গে মিলিত হতো। সময়ের প্রবাহে নদীটির এই অংশ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে; বর্তমানে এর চিহ্ন কেবল বিচ্ছিন্ন খাল, বিল ও নিম্নভূমিতে টিকে আছে।

অন্য শাখাটি কৃষ্ণপুর এস্টেট—যেখানে বর্তমানে গৌরীপুর সরকারি কলেজ অবস্থিত—এবং গোলকপুর এস্টেটের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পূর্বদিকে ভালকি নদীতে গিয়ে মিশত। নদীটির এই অংশ এখন আর পূর্ণাঙ্গ নদী নয়; বরং একটি বড় খালের রূপ ধারণ করেছে, যা অতীতের নদীপথের স্মৃতি বহন করছে। রেনেলের মানচিত্রে ভালুকা নদীর চিহ্নটি দেখা যায়। গবেষকদের মতে, বালুয়া নদীর বিলুপ্তি শুধু একটি নদীর হারিয়ে যাওয়া নয়; এটি গৌরীপুরের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জলপ্রবাহ, নগরায়ণ এবং ঐতিহাসিক ভূপ্রকৃতিরও বড় ধরনের পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে। ফলে গৌরীপুর পৌরসভার শতবর্ষের ইতিহাস অনুধাবনের ক্ষেত্রে বালুয়া নদীর অতীত অবস্থান, প্রবাহপথ এবং বিলুপ্তির কারণ নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও সংরক্ষণ উদ্যোগ সময়ের দাবি।

একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা: গৌরীপুর রামগোপালপুরদুই জমিদারির সমান্তরাল ইতিহাস বৈষম্যের নেপথ্য কারণ

বাংলার ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক ইতিহাসে ডাকঘর, টেলিগ্রাফ, থানা, আদালত এবং পৌরসভা ছিল কোনো জনপদের গুরুত্ব নির্ধারণের মূল সূচক। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বৃহত্তর ময়মনসিংহের যেসব স্থানে ডাক ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, ব্রিটিশ সরকার সেগুলোকে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করত।

ঐতিহাসিক শ্রীকেদারনাথ মজুমদার তাঁর "ময়মনসিংহের ইতিহাস" এবং "ময়মনসিংহের বিবরণ" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ১৮৭৯–৮০ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর ময়মনসিংহে মোট ৫৪টি ডাকঘর ছিল। পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলে ৩টি প্রধান ডাকঘর, ৪৬টি সাব-ডাকঘর এবং ১৪৭টি শাখা ডাকঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে ১৯০৭ সাল নাগাদ বৃহত্তর ময়মনসিংহের ৩২টি ডাকঘরে টেলিগ্রাফ সেবা চালু ছিল। এসবের মধ্যে ময়মনসিংহ, গৌরীপুর, রামগোপালপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, আঠারবাড়ী, মুক্তাগাছা, নেত্রকোণা, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, সরিষাবাড়ী ও কেন্দুয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এই তথ্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, গৌরীপুর ও রামগোপালপুর উভয়ই ঔপনিবেশিক প্রশাসনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এসব উদাহরণ দেখায় যে, ডাক ও টেলিগ্রাফ সুবিধা সাধারণত প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতিষ্ঠা করা হতো। ফলে গৌরীপুর জমিদারবাড়ি এবং রামগোপালপুর জমিদারবাড়ির প্রভাব, সম্পদ ও প্রশাসনিক গুরুত্ব যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ছিল, তা ঐতিহাসিক তথ্য থেকেই প্রতীয়মান হয়। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, মোমেনসিং পরগণার নেত্রকোণায় ১৮৮৭ সালে পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে জাফরশাহী পরগণার জামালপুরে ১৮৬৯ সালে পৌরসভা গঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে মোমেনসিং পরগণার ঈশ্বরগঞ্জে ১৮৮০ সালে চৌকি আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে একই স্থানে থানায় প্রতিষ্ঠিত হয় । এসব ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, ঔপনিবেশিক সরকার প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর উন্নয়নে ধাপে ধাপে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। মোমেনসিং পরগণা ও জাফরশাহী পরগণার মালিক ছিলেন গৌরীপুর উপজেলায় বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ১২টি জমিদারবাড়ির সকল জমিদারগণ। তবে ১৯১২–১৮ সালের দিকে গৌরীপুর জংশন রেলওয়ে স্টেশন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করে। এই রেললাইন ও জংশনের কারণে গৌরীপুর একটি প্রধান যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এর পরিধি ও গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর বিপরীতে বর্তমান সময়ে রামগোপালপুর কেবল একটি ইউনিয়ন হিসেবে টিকে থাকলেও, ঐতিহাসিকভাবে গৌরীপুর রেলওয়ে জংশনের সুবাদেই গৌরীপুর শহর হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট গৌরীপুর ও রামগোপালপুরের ইতিহাসকে নতুনভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—যদি গৌরীপুর ও রামগোপালপুর জমিদারি প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের দিক থেকে প্রায় সমমর্যাদাসম্পন্ন হয়ে থাকে, তবে ১৯২৭ সালে গৌরীপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হলেও রামগোপালপুরে কেন একই ধরনের পৌর প্রশাসন গড়ে ওঠেনি?

গৌরীপুর পৌরসভার নামকরণের ইতিহাস আজও রহস্যে ঘেরাঃ

গৌরীপুর পৌরসভার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে আজও গবেষকদের মধ্যে নানা মত ও আলোচনা রয়েছে। বাংলা ১১৭৬ বঙ্গাব্দ ও ইংরেজি ১৭৭০ সালে মোমেনসিং ও জাফরশাহী পরগণার জায়গীরদার এবং গৌরীপুরের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর পুত্র কৃষ্ণগোপালের দত্তক পুত্র ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার সহধর্মিণী আলেয়া (যিনি হীরা বা মাধুবী নামেও পরিচিত ছিলেন) এর গর্ভে জন্ম নেওয়া পুত্র সন্তান এবং পলাশীর যুদ্ধের পর তার মামা মোহনলালের আশ্রয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর জেলার জাফরশাহীর কৃষ্ণপুর জমিদারবাড়িতে হিন্দু সমাজে লালিত-পালিত যুগলকিশোর রায় চৌধুরী, মোমেনসিং পরগণার এজমালি সম্পত্তি থেকে তৎকালীন মোমেনসিং পরগণার একটি বৃহৎ অংশ নিয়ে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে বোকাইনগরের কাছে গৌরীপুর নামক শহর বা বন্দর এবং গৌরীপুর এস্টেট নামে একটি রাজবাড়ির গোড়াপত্তন করেন। গৌরীপুর প্রতিষ্ঠার পূর্বে এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক জনপদ ছিল বোকাইনগর। ময়মনসিংহের গৌরীপুর আজ একটি ঐতিহ্যবাহী উপজেলা, পৌরসভা ও গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন। এই জনপদের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গৌরীপুর রাজপরিবার এবং এর প্রতিষ্ঠাতা জমিদার যুগল কিশোর রায় চৌধুরী।

গৌরীপুর নামকরণের ইতিহাস: প্রচলিত তথ্য নাকি ইতিহাসের বিভ্রান্তি?

প্রায় আড়াইশ বছরের ইতিহাস বহনকারী গৌরীপুর আজ ময়মনসিংহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পৌর শহর। এই শহরের নামে একটি উপজেলা, একটি পৌরসভা এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো—"গৌরীপুর" নামটির প্রকৃত উৎস সম্পর্কে আজও ঐতিহাসিকভাবে সর্বসম্মত ও নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সরকারি ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন প্রচলিত সূত্রে দাবি করা হয়েছে যে, জমিদার শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর কন্যা "গৌরী"-এর নামানুসারে এ জনপদের নাম "গৌরীপুর" রাখা হয়েছিল। কিন্তু এই দাবির পক্ষে প্রাথমিক ঐতিহাসিক দলিল বা সমসাময়িক কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সাধারণত উপস্থাপিত হয় না। অন্যদিকে, আরেকটি প্রচলিত মত হলো, হিন্দু ধর্মের দেবী গৌরীর নাম থেকেই "গৌরীপুর" নামের উৎপত্তি। কিন্তু এ দাবির পক্ষেও এখন পর্যন্ত কোনো সমসাময়িক জমিদারি দলিল, প্রশাসনিক নথি কিংবা প্রামাণ্য ইতিহাসগ্রন্থে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য পাওয়া যায়নি। এখানেই বিষয়টি নতুনভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। "গৌরীপুর" নামের উৎপত্তির সুস্পষ্ট ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে অবস্থিত ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অ্যান্ড লাইব্রেরি এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স নামে সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উন্মোচনের উদ্দেশ্যে সংগঠনগুলো অপ্রকাশিত তথ্য, জনশ্রুতি, প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণ, ঝরে পড়া ইতিহাস, প্রাচীন দুর্লভ দলিল এবং মানচিত্র সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসকে হালনাগাদ করার কাজ পরিচালনা করছে। প্রামাণ্য দলিল হিসেবে এসিক এসোসিয়েশন ও ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশনের সহযোগিতায় প্রতিবছর প্রকাশিত হয় আঞ্চলিক তথ্যবহুল স্বনামধন্য ম্যাগাজিন ‘পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স’। এ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রায় আড়াইশ বছর আগের রেনেলের মানচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৎকালীন মোমেনসিং পরগণার অন্তর্গত বর্তমান গৌরীপুর উপজেলার দিকে তাকালে বোকাইনগর, সরিষাহাটি, বাশাটি ইত্যাদি নামে প্রাচীন জনপদ বা প্রসিদ্ধ স্থান হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। তখন গৌরীপুর নামটি উল্লেখ নেই যা এটি সদ্য প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে 'বোকাইনগর' গৌরীপুর উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম। সরিষাহাটি ও বাশাটি দু'টি গ্রামের নাম।

রামগোপালপুর জমিদার পরিবারের সদস্য ও ইতিহাসবিদ শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী তাঁর ১৯১১ সালে প্রকাশিত "ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার" গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর বংশলতিকা বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। সেখানে শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর কন্যাদের তালিকায় "গৌরী দেবী" নামে কোনো কন্যার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—যদি শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর "গৌরী" নামে কোনো কন্যাই না থাকেন, তবে তাঁর কন্যার নামানুসারে গৌরীপুরের নামকরণের যে প্রচলিত ব্যাখ্যা দীর্ঘদিন ধরে প্রচারিত হয়ে আসছে, তার ঐতিহাসিক ভিত্তি কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু প্রচলিত বক্তব্য নয়, বরং জমিদারি বংশলতিকা, ব্রিটিশ প্রশাসনিক রেকর্ড, ভূমি-সংক্রান্ত নথি, প্রাচীন মানচিত্র এবং সমসাময়িক ঐতিহাসিক দলিলসমূহের সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। গৌরীপুর নামকরণের প্রকৃত ইতিহাস উদ্ঘাটনের জন্য নতুন গবেষণার কাজ কয়েক বছর ধরে হয়েছিল। এদিকে স্থানীয় ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা কয়েকজন গবেষক সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঐতিহাসিক চিত্র তুলে ধরছেন। তাঁদের মতে, ১৭৭০ সালের দিকে তৎকালীন মোমেনসিং পরগণার অর্ধেক অংশ নিয়ে একটি নতুন প্রশাসনিক শহরের প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় গৌরীপুর। এই নতুন শহরের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুগলকিশোর রায় চৌধুরীর নাম জড়িয়ে আছে বলে তাঁরা দাবি করেন। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বাংলা ১১৭৬ (খ্রিস্টাব্দ ১৭৭০) সালে মোমেনসিং পরগণার এজমালি সম্পত্তির একটি অংশে বালুয়া নদীর উত্তর পাড়ে যুগল কিশোর রায় চৌধুরী গৌরীপুর এস্টেট বা রাজপরিবারের ভিত্তি স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে এই এস্টেটকে ঘিরেই গড়ে ওঠে গৌরীপুর শহর, যা ক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ও প্রশাসনিক জনপদে পরিণত হয়। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত Bengal District Gazetteers: Mymensingh-এফ. এ. স্যাকসি (F. A. Sachse) ১৫৬ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন যে: “Of Jugal Kishor Roy Chowdhury, the founder of the Gouripur Family, Mr. Wroughton wrote thus in his report of 1788.” এই উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট হয় যে, ১৭৮৮ সালের প্রশাসনিক প্রতিবেদনে যুগল কিশোর রায় চৌধুরীকে গৌরীপুর

লেখক: সাংবাদিক, শিক্ষক, গবেষক ইতিহাস সন্ধানী

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

১৯২৭ -২০২৭: গৌরীপুর পৌরসভা

ব্রিটিশ আমলে ১৯২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ময...

মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য আসছে ‘১০০-তে ১০০’ কর্মসূচি

আগামীকাল থেকে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে ‘১০০-তে ১০০’ কর...

মুন্সীগঞ্জ সদরে ৫০০ ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

মুন্সীগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ মো. দেল...

মাটিরাঙায় বিনামূল্যে স্তন ও জরায়ুর মুখ ক্যানসারের পরীক্ষা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত 

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় অসহায় নিম্মবিত্ত মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দি...

মাটিরাঙায় বিনামূল্যে স্তন ও জরায়ুর মুখ ক্যানসারের পরীক্ষা কার্যক্রম অনুষ্ঠিত 

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় অসহায় নিম্মবিত্ত মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দি...

মুন্সীগঞ্জ সদরে ৫০০ ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

মুন্সীগঞ্জে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ মো. দেল...

মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য আসছে ‘১০০-তে ১০০’ কর্মসূচি

আগামীকাল থেকে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে ‘১০০-তে ১০০’ কর...

১৯২৭ -২০২৭: গৌরীপুর পৌরসভা

ব্রিটিশ আমলে ১৯২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ময...

ভালুকায় দেশীয় মাছ রক্ষায় বিশেষ অভিযান: বিপুল পরিমাণ কারেন্ট জাল জব্দ ও ধ্বংস

ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নে দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় পরিচালিত...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা