"আমরা কাউকে ভয় পেতে আসিনি"—টুর্নামেন্ট খেলতে দেশ ছাড়ার আগে হামজা চৌধুরীর কণ্ঠে ছিল দারুণ এক আত্মবিশ্বাস। কিন্তু মাঠের নির্মম বাস্তবতার সামনে সেই কথার কোনো দামই রইল না। ফিফা আসিয়ান কাপে নিজেদের শেষ ম্যাচে গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ৯-২ গোলের ব্যবধানে লজ্জাজনক হার নিয়ে মাঠ ছাড়ল বাংলাদেশ।
গ্রুপপর্বের শুরুটা থেকেই ধুঁকছিল দল। প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে সিঙ্গাপুরের কাছে ১-০ গোলে হেরে হামজা, জামাল ও সামিতরা আগেই টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন। তবে জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে যা ঘটেছে, তা দেশের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক কালো অধ্যায়।
ম্যাচের শুরু থেকেই থমাস ডুলির শিষ্যদের খেলায় কোনো গোছালো ভাব ছিল না। ইন্দোনেশিয়ার দ্রুতগতির ও পরিকল্পিত ফুটবলের বিপরীতে বাংলাদেশ ছিল পুরোপুরি ছন্নছাড়া। একের পর এক ভুল পাস, খেলোয়াড়দের নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব আর রক্ষণভাগের চরম দুর্বলতার কারণে প্রথমার্ধেই খেসারত দিতে হয় দলকে। ম্যাচের ১১ মিনিটেই প্রথম গোল করে এগিয়ে যায় স্বাগতিকরা। এরপর ঝড়ের বেগে গোল হজম করতে থাকে বাংলাদেশ। ২০ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করার পর ৩২ মিনিটে আসে তৃতীয় গোল। এই দফায় চারজন বাংলাদেশি ডিফেন্ডার কাছাকাছি থেকেও ইন্দোনেশিয়ার আক্রমণ ঠকাতে ব্যর্থ হন।
অবশ্য ৩৬ মিনিটে সুকির ক্রসে দারুণ এক হেডে গোল করে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছিলেন শাহরিয়ার ইমন। কিন্তু সেই স্বস্তি এক মিনিটও টেকেনি। পরের মিনিটেই নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন লে বেকার, আর ৪২ মিনিটে করেন চতুর্থ গোল। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে হাবনার আরও এক গোল করলে ৬-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে বিরতিতে যায় বাংলাদেশ।
দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে লাল-সবুজের দল। ইন্দোনেশিয়া একের পর এক আক্রমণ চালালেও প্রথমার্ধের মতো গোলবন্যা আটকাতে পেরেছিল বাংলাদেশ। তবে ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঠিক এক মিনিট আগে ফের গোল হজম করতে হয়। এরপর অতিরিক্ত সময়ে রাকিবের চমৎকার এক ক্রস থেকে দারুণ প্লেসমেন্টে ইন্দোনেশিয়ার জালে বল জড়িয়ে ব্যবধান কমান ফারহান আলী। গোল করার পরপরই দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং মারামারির ঘটনা ঘটে, যার জেরে হলুদ কার্ড দেখেন স্বাগতিকদের দুই ফুটবলার। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগে ইন্দোনেশিয়া আরও দুটি গোল করলে ৯-২ গোলের বড় হার নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।
এই বড় হারের মধ্য দিয়ে পুরোনো এক লজ্জার রেকর্ডেরও পুনরাবৃত্তি হলো। এর আগে ১৯৭৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৯-০, ১৯৮২ সালে ইরানের কাছে ৯-০ এবং ১৯৮৫ সালে হংকংয়ের কাছে ৯-১ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। দীর্ঘ দুই প্রজন্ম পর আবারও ফুটবলে এমন বাজে হারের তেতো স্বাদ পেল দেশ।
পুরো টুর্নামেন্ট বিশ্লেষণ করলে বাফুফের প্রস্তুতি ও দূরদর্শিতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারত নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে না নিলে এই আসিয়ান কাপে খেলার সুযোগই পেত না বাংলাদেশ। অথচ বড় এই টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরাটা দিয়ে দেশের ফুটবলের সম্মান বাড়ানোর কথা থাকলেও, বাফুফে কর্তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কেবল 'সাফ' নিয়ে। টুর্নামেন্ট চলাকালেও গণমাধ্যমে সাফের কথাই বারবার বলেছেন কর্মকর্তারা। দেশি ও অরিজিন ফুটবলারদের নিয়ে বিশ্বকাপ খেলার মতো বড় বড় স্বপ্নের কথা বলা হলেও, মাঠের বাস্তবতা আর ফেডারেশনের পরিকল্পনার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে, তা এই আসিয়ান কাপের তিন ম্যাচে মোট ১৩ গোল হজম করার মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়ে গেল। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে করা দুটি গোলই এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের একমাত্র প্রাপ্তি ও সান্ত্বনা হয়ে রইল।
সান নিউজ/রাজীব