মৃত্যুর ২৮ বছর পরও দর্শকের হৃদয়ে অমলিন নায়ক জসীম"} বাংলা চলচ্চিত্রের একসময়কার তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা জসীম। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে রুপালি পর্দায় এসে বীরত্ব, অ্যাকশন ও লড়াইয়ের দৃশ্যে দর্শকের মনে নিজের জন্য আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর ২৮ বছর পরও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও তার অভিনয়, সংলাপ ও অ্যাকশন দৃশ্য এখনও সমানভাবে আলোচিত।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) জনপ্রিয় এই অভিনেতার ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৯৮ সালের এই দিনে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বক্সনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জসীম। তার পুরো নাম আবদুল খায়ের জসীম উদ্দিন। ছোটবেলা থেকেই সাহসী ও দুরন্ত স্বভাবের ছিলেন তিনি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরে অংশ নেন জসীম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চলচ্চিত্রে পা রাখেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে অর্জিত সাহস ও দৃঢ়তার ছাপ পরবর্তী সময়ে তার অভিনয়েও ফুটে ওঠে। বিশেষ করে অ্যাকশন ও মারপিটের দৃশ্যে নিজের স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেন তিনি।
১৯৭২ সালে ‘দেবর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হয় জসীমের। এরপর ১৯৭৩ সালে জহিরুল হক পরিচালিত ‘রংবাজ’ সিনেমায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। সিনেমাটির অ্যাকশন দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল তার নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা ‘জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপ’।
এরপর দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ সিনেমায় অভিনয় করে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন জসীম। হিন্দি সিনেমা ‘শোলে’র রিমেক এই ছবিতে তিনি গব্বর সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। খলনায়ক হিসেবে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়ার পর নায়ক হিসেবেও সমান জনপ্রিয়তা পান তিনি।
সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সবুজ সাথী’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার নায়ক হিসেবে পর্দায় হাজির হন জসীম। ছবিটি সফল হওয়ার পর খলনায়কের চরিত্র থেকে পুরোপুরি সরে এসে নায়ক হিসেবেই নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে প্রায় দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন জসীম। তার উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘দোস্ত দুশমন’, ‘কালিয়া’, ‘কাজের বেটি রহিমা’, ‘তুফান’, ‘লালু মাস্তান’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘গরিবের ওস্তাদ’, ‘রাজা বাবু’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘বুকের ধন’, ‘স্ত্রী হত্যা’ ও ‘ভালোবাসার ঘর’।
সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের ধরন বদলেছে, পরিবর্তন এসেছে দর্শকের রুচিতেও। কিন্তু জসীমের জনপ্রিয়তা এখনও অটুট। ইউটিউব শর্টস, ফেসবুক রিলসসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিতই দেখা যায় তার অভিনয়, নাচ ও অ্যাকশন দৃশ্যের ভিডিও। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই তার জনপ্রিয় সংলাপ অনুকরণ করেন। তাকে ঘিরে তৈরি হয় নানা মিম ও বিনোদনমূলক কনটেন্টও।
শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই নয়, বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ও বিনোদনমূলক কনটেন্টেও দেখা যায় জসীমের চেহারা, সংলাপ ও অভিনয়শৈলীর অনুকরণ। তার ছবি ও জনপ্রিয় সংলাপ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের পোস্টার, কার্ড ও ডিজিটাল কনটেন্ট।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে চলচ্চিত্রের রুপালি পর্দা—জসীমের জীবন ছিল বৈচিত্র্যময় ও ঘটনাবহুল। সাহসী অভিনয়, দুর্দান্ত অ্যাকশন এবং নিজস্ব অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে যে অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি, তা আজও অটুট। মৃত্যুর ২৮ বছর পরও তাই দর্শকের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছেন এই জনপ্রিয় অভিনেতা।
সান নিউজ/ রাব্বি