মাকে নিয়ে জয়নুল আবেদীনের নানা চিত্রকলা, ছবি: সংগৃহীত
নারী

বিশ্ব মা দিবস আজ

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রবাদ আছে- ‘মায়ের চেয়ে আপন কেহ নাই’। পৃথিবীর সবচেয়ে মধুরতম ডাক ‘মা’। জন্মের পর সব থেকে বেশিবার উচ্চারিত হয় ‘মা’। আর এ শব্দটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে গভীর স্নেহ, মমতা আর অকৃত্রিম দরদ।

আজ বিশ্ব মা দিবস। তাইতো বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার এই দিনটি পালিত হয় মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য।

মাকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে কোনো দিনক্ষণ প্রয়োজন হয় না। মায়ের জন্য প্রতিদিনই সন্তানের ভালোবাসা থাকে। তবু আলাদা করে একটু ভালোবাসা জানাতেই আজকের দিনটি।

‘মা’ শব্দের ভেতর জড়িয়ে আছে জন্ম, নিরাপত্তা, আত্মত্যাগ, মমতা, শিকড় আর অস্তিত্বের গল্প। একজন মানুষের জীবনে প্রথম যে আশ্রয়, স্পর্শ ও ভাষা, তার অনেকটাই শুরু হয় মায়ের মধ্য দিয়ে। তাই যুগে যুগে, সভ্যতা থেকে সভ্যতায়, ভাষা থেকে ভাষায় মায়ের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নানা রীতি তৈরি হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে সেই অনুভূতিরই একটি বৈশ্বিক প্রকাশ– বিশ্ব মা দিবস।

বাংলাদেশেও দিনটি এখন পারিবারিক এবং সাংস্কৃতিক নানা আয়োজনে পালিত হয়। তবে মা দিবসের গল্প শুধু আবেগের নয়। এর ভেতরে আছে সামাজিক আন্দোলন, ইতিহাস, প্রতিবাদ এবং একজন নারীর দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনী।

মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর ইতিহাস আধুনিক সময়ের অনেক আগের। প্রাচীন গ্রিসে মাতৃদেবী রিয়ার সম্মানে উৎসবের আয়োজন করা হতো। রোমান সভ্যতায় দেবী সাইবেলি ঘিরেও ছিল মাতৃত্বের উৎসব। পরে ইংল্যান্ডে ‘মাদারিং সানডে’ নামে একটি ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। যেখানে সন্তানরা বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনে নিজেদের পরিবার ও মায়ের কাছে ফিরে আসত। তবে আধুনিক মা দিবসের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে।

উনিশ শতকের আমেরিকায় সামাজিক অস্থিরতার সময় নারীদের স্বাস্থ্য, শিশু পরিচর্যা এবং পারিবারিক পুনর্গঠনে কাজ করতেন সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড হো এবং অ্যান রিভস জার্ভিস। ১৮৭০ সালে শান্তি ও মানবতার পক্ষে ‘মাদারস ডে প্রোক্লেমেশন’ প্রকাশ করেন জুলিয়া ওয়ার্ড হো। একই সময়ে অ্যান রিভস জার্ভিস নারীদের সংগঠিত করে শিশুস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে কাজ করছিলেন।

অ্যান রিভস জার্ভিস বিশ্বাস করতেন, পরিবার ও সমাজের জন্য মায়ের অবদানকে সম্মান জানাতে একটি দিন থাকা প্রয়োজন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই ১৯০৫ সালের ৫ মে তিনি মারা যান। মায়ের মৃত্যু বদলে দেয় তার মেয়ে জার্ভিসকে। মায়ের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, মায়ের স্বপ্ন তিনি পূরণ করবেন। এরপর শুরু হয় তার সংগ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, রাজনীতিবিদ, সামাজিক সংগঠন, সংবাদমাধ্যম– সবার কাছে তিনি চিঠি লিখতে শুরু করেন। তার আহ্বান ছিল একটাই– মায়েদের সম্মানে একটি জাতীয় দিবস ঘোষণা করতে হবে।

১৯০৮ সালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের সেন্ট অ্যান্ড্রুস মেথডিস্ট এপিস্কোপাল চার্চে আনা জার্ভিস প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করেন। সেদিন তিনি অংশগ্রহণকারীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ‘সাদা কার্নেশন’; তার মায়ের প্রিয় ফুল। এরপর ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দিবসটি ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। সরকারি ছুটিও দেওয়া হয় দিনটিতে। এর পর থেকে বিশ্বের নানা দেশ এই দিনকে নিজেদের মতো গ্রহণ করে।

তবে যে নারী মা দিবস প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিলেন, তিনিই পরে এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। কারণ আনা জার্ভিসের কাছে মা দিবস ছিল হৃদয়ের, সম্পর্কের; ব্যক্তিগত ভালোবাসার দিন। তিনি চেয়েছিলেনম সন্তানরা নিজের হাতে মাকে চিঠি লিখুক, সময় দিক, কৃতজ্ঞতা জানাক। কিন্তু খুব দ্রুত ফুলের দোকান, শুভেচ্ছা কার্ড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, উপহার ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান মা দিবসকে বাণিজ্যিক উৎসবে পরিণত করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আনা জার্ভিস। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, ‘আমি এই দিনটি ভালোবাসার জন্য চেয়েছিলাম; ব্যবসার জন্য নয়।’ এরপর তিনি ফুল ব্যবসায়ী, কার্ড কোম্পানি এবং নানা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। জীবনের সঞ্চয় পর্যন্ত ব্যয় করেন এই লড়াইয়ে। প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ১৯৪৮ সালে তিনি মারা যান।

এক শতাব্দীর বেশি সময় পর আজ মা দিবস বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়। তবে শুধু এর ইতিহাস দিয়েই মা দিবসের গল্প পূর্ণ হয় না। একসময় ভাবা হতো, মায়ের ভূমিকা পরিবার ও সন্তান লালন-পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমান সমাজে মায়ের পরিচয় বহুমাত্রিক। তিনি একই সঙ্গে সন্তানের প্রথম শিক্ষক, পরিবারের মানসিক শক্তি, কর্মজীবী নারী, উদ্যোক্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী এবং সমাজ গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন মা ভোরে উঠে পরিবারের জন্য রান্না করেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠান, আবার অফিসে যান বা নিজের ব্যবসা পরিচালনা করেন। গ্রামে একজন মা সংসার সামলে কৃষিকাজে অংশ নেন। শহরে একজন মা করপোরেট অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। অনেক পরিবারে মা এখন প্রধান উপার্জনকারীও।

তবুও বাস্তবতা হলো, পরিবারের অদৃশ্য শ্রমের বড় অংশের ভার এখনও মায়ের কাঁধেই। কর্মজীবনের চাপ, সংসারের দায়িত্ব, সন্তানের পড়াশোনা, ডিজিটাল যুগের নানা চ্যালেঞ্জ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা– সব মিলিয়ে আজকের মা প্রতিদিন এক নীরব সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যান। অনেক মা আছেন, যাদের সন্তান দূরে থাকে; ভিডিও কলে কথা বলেই দিন কাটে। অনেক মা বৃদ্ধ বয়সে একা থাকেন, অথচ একসময় সন্তানের প্রতিটি স্বপ্ন পূরণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। আবার অনেক একক মা (সিঙ্গেল মাদার) সমাজের চাপ উপেক্ষা করে সন্তানকে মানুষ করছেন। তবু মা থেমে থাকেন না।

বাংলাদেশে এই দিনটি ঘরোয়া পরিবেশে উদযাপন করা হয়। সন্তানরা মায়েদের ফুল, উপহার ও ভালোবাসার বার্তা দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করেন কবিতা, ছবি ও স্ট্যাটাসের মাধ্যমে।

মা দিবসের মূল বার্তা হলো মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ ও স্নেহের প্রতি সম্মান জানানো। এই দিনে আমরা আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে মনে করি, যিনি আমাদের প্রথম শিক্ষক, অভিভাবক ও বন্ধু।

মাকে নিয়ে আছে, সাহিত্য, চিত্রকলা ও গান। শিল্পের প্রতিটি শাখায় আছে মা। তাই বিশ্ব মা দিবসে পৃথিবীর সব মায়েরাই যেন সুখী থাকেন, সন্তান হিসেবে এই যেন হয় আমাদের সবার প্রত্যাশা।

সাননিউজ/আরএ

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

থামছেই না হামের ভয়াল থাবা

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বিশেষ এমআর টিকাদান কর্মসূচি শুরু...

ভিসার শর্ত শিথিল করলো চীন

বাংলাদেশি দর্শনার্থীদের ১৪০তম চায়না ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট ফেয়ারে (ক্যান...

সব বিভাগেই ভারি বর্ষণের সতর্কতা আবহাওয়া অফিসের

দেশের আটটি বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়ে...

ফের কমল স্বর্ণের দাম

দেশের বাজারে ফের স্বর্ণের দাম কমিয়েছে বাংলাদেশ জু...

সাবেক ডেপুটি গভর্নরের ৩ বছরের কারাদণ্ড

সম্পদ বিবরণী দাখিল না করায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় বাংলাদেশ ব্যা...

গ্রেপ্তার না করলে আত্মসমর্পণ করবেন লতিফ সিদ্দিকী

রাজধানীর শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়েছেন সাব...

পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে বিশেষ শর্ত, অভিযোগ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

সরকারি কেনাকাটায় অনেক সময় পছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্...

কমনওয়েলথ গেমসে হিটে ৩৬তম রাফি

কমনওয়েলথ গেমসে অ্যাথলেটিকসে ইমরানুর রহমান, বক্সিংয়ে জিনাত ফেরদৌসের পর এবার সা...

হবিগঞ্জে এনসিপির বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক

হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে আগা...

৪৫ বছর আগে যেভাবে সরিয়ে নেওয়া হয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা