ছবি: এআই।
জাতীয়

অনলাইনে চাকরির ফাঁদ, বাড়ছে মানবপাচার

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল 

তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানবপাচার চক্রও তাদের কৌশল পাল্টেছে। আগে যেখানে দালালদের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে মানুষকে বিদেশে নেওয়া হতো, এখন সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে মানবপাচারের নতুন ধারা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।

৩০শে জুলাই আন্তর্জাতিক মানবপাচারবিরোধী দিবস উপলক্ষে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’, যা প্রযুক্তিনির্ভর মানবপাচারের বর্তমান বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।

ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে সক্রিয় পাচারকারীরা

মানবপাচারকারীরা বর্তমানে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গ্রুপ খুলে ইউরোপে যাওয়ার লোভনীয় প্রচারণা চালাচ্ছে। সেখানে সমুদ্রপথে যাত্রার ছবি, বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন এবং দালালদের যোগাযোগ নম্বর প্রকাশ করা হয়।

একই সঙ্গে কম্পিউটার অপারেটর, কল সেন্টার এক্সিকিউটিভ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটরসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে তরুণদের বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। বাস্তবে এসব চাকরির অধিকাংশই প্রতারণার অংশ।

ইউরোপের স্বপ্ন, লিবিয়ার বন্দিজীবন

মাদারীপুরের শিবচরের বাসিন্দা মাহতাব মৃধা উন্নত ভবিষ্যতের আশায় কয়েক বছর আগে দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে লিবিয়ায় যান। পরিবার গরু বিক্রি, ঋণ এবং কিস্তির টাকাসহ প্রায় ১৪ লাখ টাকা জোগাড় করে তাঁর বিদেশযাত্রার ব্যবস্থা করে।

কিন্তু ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই শুরু হয় দুঃসহ অভিজ্ঞতা। কয়েক দিন সমুদ্রে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে মৃত্যুভয় নিয়ে কাটাতে হয়। পরে ইতালির পরিবর্তে মাল্টায় পৌঁছালে সেখানকার কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটক করে। দীর্ঘ সময় কারাভোগের পর দেশে ফিরলেও ঋণের বোঝা এবং মানসিক চাপ তাঁর জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। পরে পুনর্বাসনমূলক কাউন্সেলিং সেবা গ্রহণ করে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন।

চাকরির নামে সাইবার প্রতারণার কারখানায় বিক্রি

সম্প্রতি কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা এক বাংলাদেশি জানান, কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, সেখানে পরিচয়ের পরিবর্তে একটি কোড নম্বর দিয়ে কাজ করানো হতো এবং অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হতো। দেশ ছাড়ার আগেই পাচারকারীরা একটি গোপন কোডওয়ার্ড মুখস্থ করিয়ে দেয়, যা পুরো চক্রের যোগাযোগের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

শত শত বাংলাদেশির প্রত্যাবর্তন

চলতি বছরের জুন মাসে কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া ৫৮৩ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরে আসেন। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, ফিরে আসাদের অধিকাংশই প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। অনেককে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিল এবং বেশিরভাগের পাসপোর্ট জব্দ করে রাখা হয়।

অনিয়মিত পথে ইউরোপ যাত্রা অব্যাহত

বাংলাদেশ থেকে অনেকেই বৈধ ভিসায় সার্বিয়া, সাইপ্রাস, বেলারুশসহ ইউরোপের কাছাকাছি বিভিন্ন দেশে গিয়ে পরে অবৈধভাবে ইতালি, গ্রিস বা মাল্টায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালায় মানবপাচার চক্র।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনিয়মিত অভিবাসনের এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে এবং পাচারকারীরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ

অভিবাসন বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালিতে অনিয়মিতভাবে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ এখনও শীর্ষ দেশগুলোর একটি। চলতি বছর গ্রিসমুখী সমুদ্রপথেও বাংলাদেশিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই কয়েক হাজার বাংলাদেশি ইতালি ও গ্রিসে পৌঁছেছেন।

সমুদ্রপথে মৃত্যুর মিছিল

অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে অনেক বাংলাদেশি প্রাণ হারাচ্ছেন। চলতি বছরের মার্চ মাসে লিবিয়া থেকে গ্রিসগামী একটি নৌকা কয়েক দিন সাগরে ভেসে থাকার পর খাদ্য ও পানির সংকটে বহু যাত্রীর মৃত্যু হয়। পরে জীবিতদের অনেককে জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগও উঠে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইবার স্ক্যাম বর্তমানে মানবপাচারের অন্যতম বড় রূপ। ভুয়া ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তরুণদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। পরে তাদের জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়।

তাদের মতে, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, লাওস কিংবা ভিয়েতনামে চাকরির উদ্দেশ্যে যাওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, নিয়োগপত্র এবং ভিসার ধরন ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।

কী হতে পারে সমাধান?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবপাচার রোধে শুধু আইন প্রণয়ন করলেই যথেষ্ট নয়; আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মানবপাচারপ্রবণ এলাকায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, পাচারচক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার এবং আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা গেলে অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সান নিউজ/ জামান

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

জনগণের স্বার্থে পুলিশ-গণমাধ্যম বন্ধু : ডিএমপি কমিশনার

পুলিশ ও গণমাধ্যম জনগণের স্বার্থে পরস্পরের বন্ধু এবং উভয়ের দায়িত্ব একে অপরের প...

সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ সাময়িক বরখাস্ত

অসদাচরণের অভিযোগে পুলিশের সাবেক সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত ডিআইজি (সাবেক পুলিশ স...

একাদশে ভর্তির প্রথম ধাপের ফল আজ

২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইনে ভর্তির প্রথম ধাপের ফল আজ বুধবার (১...

জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে স্পিকারের সাক্ষাৎ , গণতন্ত্র পুনর্গঠনের আশ্বাস

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন...

আশ্বাসের পর বেড়েছে গ্যাস সরবরাহ: মাহদী আমিন

ব্যবসায়ী ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের গ্যাস সরবরাহ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া...

কেইন-এমবাপ্পেকে নয়, ব্যালন ডি’অর মেসিরই পাওয়া উচিত: বেকহ্যাম

ক্যাম্পিওনেস কাপের ফাইনালে ইন্টার মায়ামির জয়ে আবারও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দ...

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ৪ প্রত্যক্ষদর্শীকে নদীতে ফেলার অভিযোগ

বিডিআর হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলামসহ চারজনকে বলেশ্বর নদীতে নিয়ে চ...

জিমের যে ভুলে কমতে পারে প্রজনন ক্ষমতা

শরীর সুস্থ রাখা, পেশি গঠন ও ফিটনেস ধরে রাখতে অনেক তরুণ নিয়মিত জিমে গিয়ে ভারোত...

স্ত্রীসহ আসিফ মাহমুদের তথ্য চাইল দুদক

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপা...

বগুড়ায় আনসার সদস্যদের ওপর হামলা, আটক ৪

বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে হট্টগোল থামাতে গিয়ে...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা