বিজয়া দশমী মানেই রসগোল্লা, সন্দেশ আর হরেক রকমের মিষ্টির সমাহার। চন্দ্রপুলি, তিলের নাড়ু কিংবা নারকেলের ছাঁচে গড়া নাড়ুর মিষ্টি স্বাদে চারপাশ ম ম করলেও, আধুনিক যান্ত্রিকতায় ও ব্যস্ততার যুগে এখন আর ঘরে ঘরে সেই সাবেকিয়ানার খাটাখাটনি করার ফুরসত কারোরই নেই।
বাধ্য হয়েই বাজারের কেনা মিষ্টি দিয়ে সারতে হয় আপ্যায়ন। কিন্তু সারাদিন মিষ্টিমুখ করতে করতে অতিথিদের মুখ যখন কিছুটা অরুচিকর হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই জিভ চায় একটু ভিন্ন কিছু—এক চিলতে নোনতার ছোঁয়া। দেবী বিসর্জন সম্পন্ন হলেও কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ের পালা চলতে থাকে। এসময়ে অতিথি আপ্যায়নে মিষ্টির একঘেয়েমি কাটাতে নোনতা পদের জুড়ি মেলা ভার।
একসময় আমাদের দাদী-নানীদের হেঁশেলে দশমীর দিনে ঘরে ঘরে ভাজা হতো মুচমুচে কুচো নিমকি। যদিও বর্তমান সময়ে সেসবের ঠাঁই হয় মুদির দোকানের বয়ামে, তবুও নিজের হাতের ছোঁয়া আর ভালোবাসায় তৈরি নিমকির স্বাদই একেবারে আলাদা। একটুখানি সময় বের করে যদি ঘরেই তৈরি করে নেওয়া যায় বাহারি স্বাদের এই স্ন্যাক্স, তবে ছোট থেকে বড়—সব বয়সি অতিথিই বেশ তৃপ্তি পাবেন।
এককালীন পরিশ্রমে তৈরি এসব নিমকি দিয়ে জমিয়ে তুলতে পারেন আপনার এবারের বিজয়ার আড্ডা।
মেথি নিমকি: সুবাস ও স্বাদের মেলবন্ধন : টাটকা মেথিশাকের সুবাস নিমকিকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। তবে শরৎকালের এই সময়ে টাটকা মেথিশাক পাওয়া মুশকিল হলে ভরসা রাখতে পারেন কসৌরি মেথির ওপর।
প্রথমে পরিমাণমতো ময়দায় স্বাদমতো লবণ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে কসৌরি মেথি মিশিয়ে নিন। যদি টাটকা মেথিশাক পেয়ে যান, তবে তা মিহি করে কুচিয়ে ময়দা মাখার সময় ব্যবহার করতে হবে। এরপর সাদা তেল কিংবা খাঁটি ঘিয়ের ময়েন দিয়ে ভালো করে ঝুরঝুরে করে মেখে সামান্য কুসুম গরম জল দিয়ে আটা বা ময়দার মতো খামির তৈরি করুন।

ওপরে কিছুটা তেল বুলিয়ে একটি ভেজা কাপড় বা ঢাকনা দিয়ে ২০ মিনিট ঢেকে রাখুন। এরপর পছন্দমতো তিনকোনা বা কুচো আকারে কেটে ডুবো তেলে মচমচে করে ভেজে নিন। পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়ার পর কাচের বৈয়ামে ভরে রাখলে অনায়াসেই মাসখানেক মুচমুচে থাকবে।
খাস্তা নিমকি: স্তরে স্তরে মুচমুচে খাস্তার জাদু : এই পদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতিটি স্তর বা পরত আলাদা হয়ে থাকে। একটু সময় সাপেক্ষ হলেও এর স্বাদ অতিথিদের মন জয় করতে বাধ্য।
ময়দার সঙ্গে লবণ, সামান্য বেকিং সোডা এবং সাদা তেলের ময়েন মিশিয়ে নরম করে মেখে নিন। মাখানো হয়ে গেলে তেল মাখিয়ে একটি পাত্রে কাপড় চাপা দিয়ে কুড়ি মিনিট রেখে দিন। এর ফাঁকে এক বাটি ঘি গলিয়ে ঠান্ডা করে তার মধ্যে দুই চামচ কর্নফ্লাওয়ার ভালো করে মিশিয়ে একটি মিশ্রণ তৈরি করুন। মিশ্রণটি কিছুক্ষণ রাখলেই কিছুটা জমে যাবে।
এবার ময়দা থেকে লেচি কেটে তেল দিয়ে যতটা সম্ভব পাতলা করে তিনটি গোল রুটির মতো বেলে নিন। প্রতিটি রুটির ওপর তৈরি করা ঘি-কর্নফ্লাওয়ারের মিশ্রণ ভালো করে ব্রাশ করে কিছুটা ময়দা ছড়িয়ে দিন।

এভাবে একটির ওপর আরেকটি করে মোট তিনটি রুটি সাজিয়ে নিন। মাঝের স্তরগুলোতেও একই নিয়মে মিশ্রণ ও ময়দা দিতে হবে। সবশেষে রুটিগুলোকে চৌকো আকরে মুড়ে কিছু সময় রেখে দিয়ে হালকা বেলুন। এবার ছুরি দিয়ে বরফি বা আয়তাকার শেপে কেটে ডুবো তেলে ভেজে নিলেই তেলতেলে খাস্তা ভাব ফুটিয়ে প্রতিটি লেয়ার আলাদা হয়ে ফুলে উঠবে।
কামরাঙা নিমকি: দেখতে সুন্দর, খেতে চমৎকার : নলকূপের ঠান্ডা জল বা চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে কামরাঙা আকৃতির এই পেঁচানো নিমকি দারুণ মানিয়ে যায়।
ময়দায় একটু বেশি পরিমাণ ঘিয়ে ময়েন, স্বাদমতো লবণ, সামান্য চিনি আর চিমটিখানেক বেকিং সোডা দিয়ে ভালো করে ময়ান দিয়ে নিন। তেল মাখিয়ে সেই ডো বা খামিরটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখুন কুড়ি মিনিটের জন্য।

এরপর লেচি কেটে লুচির মতো পাতলা করে বেলে নিন। গোল সেই লুচির দুই পাশের পরিধি থেকে সামান্য জায়গা ফাঁক রেখে ছুরির মাথা দিয়ে সমান মাপে লম্বালম্বি ফালি করে কেটে নিন। এবার দুই প্রান্ত ধরে কায়দা করে মুড়ে নিতে হবে—প্রথমে একপাশ, তারপর অন্যপাশ।
দুই প্রান্ত ভাজ করার পর নিমকিটিকে হালকা হাতে টুইস্ট বা প্যাঁচ দিয়ে দিলেই হুবহু কামরাঙার রূপ ধারণ করবে। গরম ডুবো তেলে সোনালী রঙ করে ভেজে তুললেই তৈরি হয়ে যাবে দারুণ আকর্ষণীয় কামরাঙা নিমকি।
সান নিউজ / রাজীব