রাজধানী ঢাকা ও আশুলিয়ায় কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক সন্দেহজনক বস্তু এবং বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে দুটি ক্ষেত্রে প্রকৃত ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট এলাকায় পাওয়া সন্দেহজনক বস্তুতে বিস্ফোরকের অস্তিত্ব মেলেনি।
তবে ধারাবাহিক এসব ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, এগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি পরিকল্পিতভাবে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির কোনো অপচেষ্টা। এই প্রেক্ষাপটে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের সব পুলিশ ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
তদন্তে এখনো শনাক্ত হয়নি জড়িতরা
কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) সূত্র জানিয়েছে, মতিঝিল ও আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া বিস্ফোরক কারা রেখেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একাধিক তদন্তকারী দল ঘটনাগুলোর সূত্র খুঁজে বের করতে কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তও চলছে।
কর্মকর্তাদের মতে, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের পরই প্রকৃত উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হবে।
মতিঝিল ও আশুলিয়ায় উদ্ধার হয় শক্তিশালী বিস্ফোরক
গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে একটি পরিত্যক্ত ছাতার ভেতর থেকে প্রায় দেড় কেজি ওজনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাইপ বোমা উদ্ধার করে বোম ডিসপোজাল ইউনিট। নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করার সময় একজন পথচারী আহত হন।
এর ছয় দিন পর সাভারের আশুলিয়ার একটি মুদি দোকানে রাখা ট্রাভেল ব্যাগের ভেতর প্রেসার কুকারে তৈরি টাইমারযুক্ত আইইডি উদ্ধার করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরকটি নির্দিষ্ট সময়ে বিস্ফোরণের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় ছিল।
মিরপুর ও ফার্মগেটে আতঙ্ক, পরে মিলল স্বস্তির খবর
শনিবার সকালে মিরপুর-১০ এবং ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে সন্দেহজনক বস্তু দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে বোম নিষ্ক্রিয়কারী দল পরীক্ষা করে জানায়, মিরপুরে পাওয়া বস্তুটি ছিল পান-সুপারির একটি কৌটা এবং ফার্মগেটে পাওয়া বস্তার ভেতরে ছিল পরিত্যক্ত আবর্জনা। ফলে ওই দুটি ঘটনায় জননিরাপত্তার কোনো ঝুঁকি ছিল না।
প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে গুরুত্ব
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আশুলিয়ায় উদ্ধার হওয়া আইইডির নির্মাণকৌশল, ব্যবহৃত বিস্ফোরক উপাদান, টাইমিং ডিভাইস এবং অন্যান্য আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল তথ্য ও সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের গতিবিধি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়নি।
ছোট গোপন নেটওয়ার্ক নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে কিছু ব্যক্তি ঘরে বসেই আইইডি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় উগ্রবাদী কার্যক্রমের অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্তে এমন তথ্যও এসেছে, অভিযুক্তদের কেউ কেউ বিদেশে বিস্ফোরক তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। এছাড়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনক্রিপটেড অ্যাপ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে ছোট ছোট গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে উগ্রবাদী কার্যক্রম আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। বড় ধরনের হামলা না হওয়াকে ঝুঁকি শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করার সুযোগ নেই। অনলাইন প্রচারণা, গোপন যোগাযোগ এবং ক্ষুদ্র নেটওয়ার্কের বিস্তার ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের কারণ।
তাদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই উগ্রবাদ প্রতিরোধ আরও কার্যকর করা সম্ভব।
পুলিশের সর্বোচ্চ সতর্কতা
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর দেশের সব ইউনিটকে জরুরি নিরাপত্তা নির্দেশনা দিয়েছে। এতে পুলিশের জিপ, পিকআপ, বাসসহ সরকারি যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে কোনো যানবাহন প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রাখা যাবে না। চালক বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য ছাড়া কোনো সরকারি যানবাহন ফেলে রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে থানা, পুলিশ লাইন, অফিস কম্পাউন্ড ও অন্যান্য সরকারি স্থানে রাখা যানবাহনের নিরাপত্তা বাড়াতে নিয়মিত টহল, নজরদারি এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি বা বস্তু শনাক্তে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত তদন্ত শেষ করা, দায়ীদের শনাক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি, এই তিনটি পদক্ষেপ ভবিষ্যতে সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।