কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার কাজীরচর গ্রামে আড়িয়াল খাঁ নদীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া তিতাস গ্যাসের প্রধান সঞ্চালন পাইপলাইনে ভয়াবহ লিকেজের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চচাপে গ্যাস বের হলেও এখনো তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীপারের একটি চুন তৈরির কারখানায় অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করার সময় পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীর পানির ওপর সার্বক্ষণিক গ্যাসের বুদবুদ দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র গ্যাসের গন্ধ। এতে নদীপারের মানুষের মধ্যে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তিতাস গ্যাস সূত্র ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন দশক আগে নরসিংদী থেকে কিশোরগঞ্জে গ্যাস সরবরাহের জন্য আড়িয়াল খাঁ নদীর তলদেশ দিয়ে এই সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। সম্প্রতি পাইপলাইনের একটি ওয়েল্ডিং জয়েন্টে ছিদ্র সৃষ্টি হলে সেখান থেকে উচ্চচাপে গ্যাস বের হতে শুরু করে।
স্থানীয়দের দাবি, গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে রাতের আঁধারে নদীর তলদেশে থাকা ওই পাইপলাইনে ফুটো করে গ্যাস সংযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। প্রবল বৃষ্টির কারণে কাজ শেষ না হওয়ায় ফুটো হওয়া অংশ কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। পরে নদীর পানিতে বুদবুদ ও গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
তাদের অভিযোগ, স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের সহযোগিতায় জুনের শুরুতে নদীতীরে ১৭ শতাংশ জমিতে একটি চুন কারখানা স্থাপন করা হয়। কারখানার মালিক সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বাজনামহল এলাকার দেলোয়ার হোসেন তালুকদার। তবে কারখানার মালিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কাজীরচর গ্রামের বাসিন্দা সোহেল মিয়া ও বিল্লাল মিয়া জানান, এক মাস আগে সন্ধ্যার দিকে কয়েকজন ব্যক্তি ওই কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিচয় জানতে চাইলে তারা নিজেদের তিতাস গ্যাসের লোক বলে পরিচয় দেন। এর কিছুদিন পর থেকেই পাইপলাইন থেকে গ্যাস বের হতে শুরু করে।
তারা বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও দীর্ঘ সময় ধরে লিকেজ বন্ধ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
লিকেজ মেরামতের দায়িত্বে থাকা নোমান মিয়া জানান, পাইপলাইনের ওয়েল্ডিং অংশে বড় ধরনের ছিদ্র হওয়ায় মেরামতকাজ জটিল হয়ে পড়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ২০ থেকে ২৫ জন কর্মী নিরলসভাবে কাজ করছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে লিকেজ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।
মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুবকর সিদ্দিক বলেন, বিষয়টি জানার পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কারখানার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য তার কাছে নেই।
এদিকে, চুন কারখানার মালিক বা তার কোনো প্রতিনিধির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইপলাইন লিকেজের প্রকৃত কারণ জানতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিতাস গ্যাসের কিশোরগঞ্জ কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মোশারফ হোসেন বলেন, নদীর তলদেশে থাকা এ পাইপলাইনটি ময়মনসিংহ জোনের অধীন। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জোনের কর্মকর্তারাই বিস্তারিত তথ্য দিতে পারবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, লিকেজের খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। লিকেজের পাশেই পাথর থেকে চুন তৈরির একটি কারখানা রয়েছে। কারখানাটির বৈধ কাগজপত্র যাচাই করা হবে। তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে, অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেওয়ার চেষ্টার সময় পাইপলাইনে লিকেজের ঘটনা ঘটেছে কি না।
দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাসের অপচয় এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, দ্রুত লিকেজ মেরামত, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।