এআই ছবি
জাতীয়

মাদক দমনে সরকারের নতুন কৌশল

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল

দেশে মাদকের বিস্তার রোধ এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহ প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। শুধু অভিযাননির্ভর কৌশল থেকে সরে এসে এবার সচেতনতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা তথ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা—এই পাঁচটি স্তম্ভকে ভিত্তি করে নতুন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মাদক প্রতিরোধের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে জাতীয় পর্যায়ে একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর আওতায় ২ হাজার প্রশিক্ষক বা মেন্টর তৈরি করা হবে এবং দেশের ২০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন করা হবে। এসব কমিটি নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাঙ্গনে মাদক প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি জোরদার করতে ১০০টি অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশে ৩৫ হাজার নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি ৬০ দিনের বিশেষ অভিযানে ২০০টি নির্ধারিত টার্গেটে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে মাদক চক্রের নেটওয়ার্ক দুর্বল হবে এবং অবৈধ মাদকের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

অভিযানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা কেনা হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের ন্যাশনাল টার্গেটিং সেন্টার (এনটিসি) গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানে সহায়তা করবে।

সরকারের পরিকল্পনায় জনসম্পৃক্ততাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের সব বিভাগ ও জেলায় কর্মশালা এবং গণশুনানির আয়োজন করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সরাসরি মতামত দিতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাদক প্রতিরোধ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন। ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান আরও কার্যকর করতে জেলা, উপজেলা ও মহানগরের থানাভিত্তিক অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রস্তুত ও নিয়মিত হালনাগাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে মাদক মামলার তদন্ত, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং নেটওয়ার্ক ভাঙার কাজ আরও সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

মাদকের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে অর্থপাচার শনাক্তকরণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য ৫০ জন কর্মকর্তাকে মানি লন্ডারিং বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাদকমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রথম ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল বিভাগে স্ক্রিনিং ডোপ টেস্ট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এটি ময়মনসিংহ, রংপুর ও খুলনা বিভাগেও সম্প্রসারণ করা হবে।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, মাদকবিরোধী লড়াই শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানের ওপর নির্ভর করলে সফল হবে না। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, জনসচেতনতা, গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং মাদক চক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ধ্বংস—সব ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের ঘোষিত উদ্যোগগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে মাদক নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এজন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।


মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মাদকবিরোধী অভিযানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ৩০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা কেনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অভিযানের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত করা সহজ হবে, প্রমাণ সংরক্ষণে কার্যকারিতা বাড়বে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও বৃদ্ধি পাবে।


তরুণদের সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ জোরদার করতে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে ‘মাদকবিরোধী ব্রিগেড’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব ব্রিগেডে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ক্লাবের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সরকারের প্রত্যাশা, স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর মাধ্যমে মাদকবিরোধী আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শিক্ষা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত এ কর্মপরিকল্পনা দেশে মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অধ্যাপক, গবেষক ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, মাদক একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সংকট। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মানবাধিকার—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান বাড়ালেই হবে না, প্রতিরোধমূলক শিক্ষা, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী মেন্টর তৈরি এবং কমিটি গঠনের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। তবে এসব কার্যক্রম যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

ড. সহিদুজ্জামান আরও বলেন, মাদক কারবারিদের অর্থের উৎস শনাক্ত, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর অভিযান এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে মাদক চক্রের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

র‍্যাবের সাবেক গোয়েন্দা প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) খায়রুল ইসলাম বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মাদকের অর্থায়নের উৎস শনাক্তকরণ এবং সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে মাদক চোরাচালান ও কারবারিদের নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মাদক সিন্ডিকেট প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযানের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে জনআস্থা বাড়বে এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, ১২০ দিনের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম বাস্তবায়ন চলছে এবং পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হবে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। লক্ষ্য শুধু মাদক উদ্ধার নয়, বরং মাদক সিন্ডিকেটের অর্থায়ন ও নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়ে একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

তিনি জানান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মাদকবিরোধী মেন্টর তৈরি, কমিটি গঠন, মাদক কারবারিদের হালনাগাদ তথ্যভান্ডার প্রস্তুত এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে মাদকের সরবরাহ, চোরাচালান এবং অপরাধী চক্রের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

মুন্সীগঞ্জে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন 

মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাহাবুব আলম বাবুর বিরুদ্ধে দায়ের করা...

নিরাপদ অভিবাসনে প্রতারণার ঝুঁকি কমে: জেলা প্রশাসক নুরমহল আশরাফী

নিরাপদ, নিয়মিত ও বিধিসম্মত অভিবাসনের মাধ্যমে বিদেশগামী কর্মীদের প্রতারণার ঝুঁ...

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ আদালতের সিদ্ধান্তে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত...

কুষ্টিয়ায় ক্যান্সার সচেতনতামূলক সেমিনার

কুষ্টিয়ার মিরপুরে ক্যান্সার সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারে প্রা...

লাখ টাকার ফল-নাস্তা নিয়ে সাবেক ইউএনওকে ঘিরে প্রশ্ন

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল ইসলামের বিরু...

নোয়াখালীতে জিও ব্যাগ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, এলাকাবাসীর মানববন্ধন

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার পূর্ব চরবাটা ইউনিয়নের সেলিম বাজার ও কালাদুর এলাকায়...

শহীদ আহসান জুলাই যোদ্ধা নন: বিএনপি নেতা

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হকের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জু...

হাসিনা দিল্লিতে, পরিবারের অন্য সদস্যরা কে কোথায়?

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ...

স্বাস্থ্য সচিবকে সব হাসপাতালে সার্কুলার জারি করতে হবে: হাইকোর্ট

দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের সরকারি ও বেসরকারি সব হাসপাতাল এবং ক্লিনিকে জরুরি চিক...

র‍্যাবের পরিবর্তে নতুন বাহিনী, কী আছে খসড়া আইনে? 

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যা...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা