এল-ফাশার থেকে পালিয়ে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষেরা তাউইলার এক ক্যাম্পে পোড়া কাঠ-ছাইয়ের মাঝে ছায়ায় বসে আছেন। ছবি : এএফপি
আন্তর্জাতিক
এক বছর আগের ভয়াল গণহত্যা

সুদানের দারফুরে ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকার আর্তনাদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

একনজরে দারফুরের ভয়াবহতার চিত্র

  • ভয়াল গণহত্যা: দীর্ঘ অবরোধের পর সুদানের উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশার শহরে আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফের চালানো নারকীয় তাণ্ডব ও নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
  • বাস্তুচ্যুত মানুষের মানবেতর জীবন: শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া লাখ লাখ মানুষ বর্তমানে তাউইলাসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে চরম খাদ্যসংকট, তীব্র শীত ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
  • চিকিৎসাসেবার করুণ দশা: অবরুদ্ধ শহরটির হাসপাতালগুলোতে ওষুধ, বিদ্যুৎ ও জরুরি সরঞ্জামের অভাবে চিকিৎসকেরা মোবাইল টর্চলাইট জ্বেলে মুমূর্ষু রোগীদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন।
  • প্রবেশের কড়াকড়ি: বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের ভিটেমাটিতে বা ফেলে আসা ঘরে ফিরতেও সাধারণ মানুষকে এখন নৃশংস আরএসএফ বাহিনীর অনুমতি নিতে হয়।
  • বিশ্ববাসীর নীরবতা: সুদানজুড়ে চলা এই ভয়াবহ মানবিক সংকট ও গণহত্যার প্রকৃত চিত্র এবং নিহতের সঠিক সংখ্যা এখনো পুরোপুরি অজানাই রয়ে গেছে।


এক বছর আগের কথা। সুদানজুড়ে তখন চলছে চরম ক্ষমতার লড়াই। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মদদপুষ্ট আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) উত্তর দারফুরের রাজধানী এল-ফাশার শহরটি দখল করে নেয়।

দীর্ঘ অবরোধের পর শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সেই দিনগুলোতে সেখানে চালানো হয় এক নৃশংস গণহত্যা। নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ আর চরম লুটপাটের শিকার হন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।

ঠিক এক বছর পর, সেই নরকীয় তাণ্ডবের সাক্ষী ও বেঁচে যাওয়া মানুষেরা ফিরে তাকিয়ে দেখছেন তাদের সর্বস্ব হারানোর বেদনা। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের (এমইই) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই সময়ের ভয়াল রূপ এবং বেঁচে থাকা মানুষদের বর্তমান দুর্বিষহ জীবনের চিত্র।

ঘরে ফিরতেও লাগে অনুমতি : হালার (ছদ্মনাম) বাড়ি ছিল এল-ফাশারে। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন তাউইলা নামের একটি শরণার্থী ক্যাম্পে। ঘটনার তিন সপ্তাহ আগে তিনি ছোট একটি গাড়িতে চেপে নিজের শহরে ফিরে যান। গাড়িটি চালাচ্ছিল সেই আরএসএফ বাহিনী, যারা একদিন তার জীবন ছারখার করে দিয়েছিল।

শহরে পা রেখেই হালা দেখেন, সবকিছু কেমন যেন বদলে গেছে। ঘরবাড়িগুলো হয় লুটপাট করা হয়েছে, নয়তো পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গাড়ি থেকে নামতেই আরএসএফ যোদ্ধারা তাকে ঘিরে ধরে। জানতে চায় তিনি কোথায় যাচ্ছেন।

জন্মসনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো জরুরি কিছু নথিপত্র আনতে পারিবারিক বাড়িতে যাওয়ার কথা জানান হালা। তবে সন্দেহের বশে তারা তার বাড়ির সঠিক অবস্থান ও কয়দিন থাকবেন, তা খুঁটিয়ে জানতে চায়।

RSF in el-Fasher

অনেক কড়াকড়ি আর জেরার পর তাকে একটি প্রবেশপত্র বা এন্ট্রি পারমিট দেওয়া হয়—যেখানে লেখা ছিল তার নাম, স্বাক্ষরের তারিখ। হালা বলেন, "ওদের সঙ্গে কথা বলা বা চলাফেরা করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তারা যেকোনো সময় আপনার বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারে, অসম্মান করতে পারে। প্রতিবাদ করলেই জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটাতে হবে।"

একদিন রাস্তায় চলাচলের সময় কিছু আরএসএফ যোদ্ধা তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করে। চারপাশের সাধারণ মানুষের উপস্থিতির কারণে সে যাত্রায় তিনি শারীরিক লাঞ্ছনা থেকে বেঁচে যান। পরে তড়িঘড়ি করে তিনি আবার তাউইলা ক্যাম্পে ফিরে আসেন। হালা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পরিস্থিতি যতই বদল হোক না কেন, তিনি আর কখনো ওই শহরে ফিরে যাবেন না।

শিল্পবিপ্লবের মতো নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ : ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর। দীর্ঘ ৫০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে শহরটি অবরুদ্ধ করে রাখার পর চূড়ান্ত আক্রমণ চালায় আরএসএফ। সুদানের গৃহযুদ্ধে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় এবং বর্বরতম এক ম্যাসাকার বা গণহত্যা। ইয়েলের হিউম্যানিটারিয়ান রিসার্চ ল্যাবের গবেষকদের মতে, ওই হত্যাকাণ্ডের গতি এবং ভয়াবহতা রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙ্গেই কেবল তুলনীয়।

ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নৃশংসতার মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ঘাতকরা নিজেরাই সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও করে রেখেছিল। পুরুষদের আলাদা করে সারিবদ্ধভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়, আর নারীদের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন।

শহর পতনের ছয় সপ্তাহ আগেই প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছিল লক্ষাধিক মানুষ। তবে শহর ঘেরাওয়ের সময় ভেতরে আটকা পড়েছিল প্রায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ঠিক কত মানুষের প্রাণ গেছে, তার সঠিক হিসাব হয়তো কখনোই জানা যাবে না।

স্যাটেলাইট ইমেজের সাহায্য নিয়ে শুধু প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই অন্তত ৬ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছিল। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় লাশের সঠিক হিসাব আজও অজানা।

হাসপাতালের অন্ধকার আর চিকিত্সকদের অসহায়ত্ব : অবরোধের সময় এল-ফাশারের ভেতরের পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা তুলে ধরেছেন এক চিকিৎসক। তিনি জানান, মাসের পর মাস অবরুদ্ধ থাকায় হাসপাতালে কোনো ওষুধপত্র পৌঁছাতে পারেনি। জেনারেটর চালানোর মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় হাসপাতালের ভেতরে নেমে আসত ঘুটঘুটে অন্ধকার। চিকিৎসকেরা মোবাইলের টর্চলাইট জ্বেলেই জীবন বাঁচানোর জরুরি অপারেশনগুলো করেছেন।

গর্ভবতী মায়েরা শত শত মাইল বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে হাসপাতালে এলেও তাদের জন্য ছিল না কোনো পর্যাপ্ত চিকিৎসা,খাদ্য। অ্যান্টিবায়োটিক বা সার্জারির গজের মতো অতি জরুরি উপাদানগুলোও শেষ হয়ে গিয়েছিল। চোখের সামনে রোগীদের ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখা ছাড়া চিকিৎসকদের তখন আর কিছুই করার ছিল না।

ত্রাণের খোঁজে মানবেতর জীবন : এল-ফাশার ছেড়ে যারা প্রাণ বাঁচাতে পেরেছেন, তাদের বর্তমান অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। তাউইলা এখন প্রায় আট লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়নকেন্দ্র। এল-ফাশার থেকে পালিয়ে আসা হানিন নামের এক নারী জানান, তিনি শুধু তার শিশুকন্যাকে নিয়ে কোনোমতে পালিয়ে বাঁচতে পেরেছিলেন। কিন্তু বেঁচে থাকা মানেই যে আর কষ্ট নেই, তা নয়। ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

আরেক বয়স্ক নারী খাদিজা পালিয়ে এসেছিলেন এল-জেনেিনা থেকে। আশ্রয় নিয়েছিলেন এল-ফাশারে। কিন্তু সেখানেও সংঘাত শুরু হলে তাকে আবারও পালাতে হয়। বর্তমানে তিনি একটি খোলা আকাশের নিচে গাছের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। তীব্র শীত, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে চলছে তার বেঁচে থাকার লড়াই।

সুদানের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটে লাখো মানুষের জীবন আজ ধ্বংসের মুখে। বিশ্ববাসীর চোখের আড়ালে দারফুরের এই জনপদে প্রতিদিন ঝরে পড়ছে সাধারণ মানুষের অমূল্য প্রাণ। বেঁচে থাকা মানুষেরা শুধু একটি সুন্দর সকালের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, কবে এই ধ্বংসের খেলা শেষ হবে।

মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন সাংবাদিক রাজীব দাস

সান নিউজ / রাজীব

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

৩ নভেম্বরের মহাসমাবেশ সফল করতে রংপুরে মাদ্রাসা শিক্ষকদের প্রস্তুতি সভা

সারাদেশের স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয়করণের দাবিতে আগামী ৩ নভেম্বর ঢাক...

স্কুলের গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে

কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই স্কুলের ৪টি গাছ কেটে ফেলা...

অটিজম-ডাউন সিনড্রোম চিকিৎসায় সাড়া ফেলেছেন ডা. মুছা

একটি শিশু যখন কথা বলতে পারে না, নিজের পায়ে হাঁটতে...

মুন্সীগঞ্জে ৩ কেজি গাঁজাসহ নারী গ্রেপ্তার

মুন্সীগঞ্জের পদ্মা সেতু উত্তর থানার খানবাড়ি বাসস্ট...

নারীর আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল, গ্রেপ্তার ৩

মুন্সীগঞ্জে এক নারীর অজ্ঞাতে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ ক...

নরসিংদীর বড় বাজারে প্রকাশ্যে বাজির রমরমা বেচাকেনা

সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী বড় বাজারে প্রকাশ্যে চড়া দামে...

দানা বাঁধছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, সমুদ্রবন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত

বঙ্গোপসাগর এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপটি ঘনীভূত হয়ে ইতোমধ্...

ফিটনেসবিহীন বাস বন্ধ ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রদলের স্মারকলিপি

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন...

সবজি আনতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে নারীর মৃত্যু, মেয়ে আহত

নোয়াখালীর সেনবাগে বাড়ির পাশের খেত থেকে সবজি আনতে গ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা