সংগৃহিত ছবি
স্বাস্থ্য

সরকারি হাসপাতালে রোগীর ঢল, বাড়ছে দালালচক্র

খোন্দকা নিয়াজ ইকবাল

উন্নত চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয়ের আশায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ রাজধানী ঢাকায় ছুটে আসছেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রোগীদের প্রথম পছন্দ সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করছেন এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, খাদ্যে ভেজাল, পরিবেশ দূষণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে সংক্রামক ও অসংক্রামক নানা রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এর ফলে রাজধানীর বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন নতুন রোগীর চাপ যোগ হচ্ছে।

জেলা পর্যায়ে সীমিত চিকিৎসাসেবা, ঢাকামুখী রোগীর স্রোত

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে অনেক সরকারি হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচার, আইসিইউ সুবিধা, উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। ফলে জটিল রোগে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষ শেষ পর্যন্ত রাজধানীর হাসপাতালেই চিকিৎসার জন্য আসতে বাধ্য হন।

এদিকে সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার দীর্ঘ অপেক্ষা ও অতিরিক্ত ভিড়কে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক দালাল চক্র। তারা রোগীদের বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে গিয়ে কমিশনভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনা করে।

দালাল চক্রের প্রতারণায় আর্থিক ক্ষতির শিকার রোগীরা

হাসপাতাল এলাকায় সক্রিয় দালালরা রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা, দ্রুত চিকিৎসা কিংবা বিশেষ চিকিৎসকের নাম করে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। সেখানে অতিরিক্ত খরচ, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কিংবা নিম্নমানের চিকিৎসার কারণে বহু রোগী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসা বা অব্যবস্থাপনার অভিযোগও উঠছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানী থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত বহু হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের যথাযথ অনুমোদন, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা দক্ষ জনবল নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দালালদের সরাসরি যোগাযোগ থাকায় রোগীদের নানা কৌশলে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, বারবার ফিরে আসে দালালরা

বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, দালালদের আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হলেও কিছুদিন পর তারা আবার একই কার্যক্রম শুরু করে। ফলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।

নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের আশপাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে তোলার সুযোগ না থাকলেও বাস্তবে বছরের পর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। এতে রোগী হয়রানি আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যালে শয্যার চেয়ে রোগী দ্বিগুণ

দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নির্ধারিত শয্যা ২ হাজার ৬০০ হলেও বর্তমানে সেখানে পাঁচ হাজারেরও বেশি রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগ মিলিয়ে সাত হাজারেরও বেশি মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন।

হাসপাতালের সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত থাকলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় রোগীদের। এই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগিয়ে দালালরা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে রোগীদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়।

অভিযানে ধরা পড়েছে অবৈধ কার্যক্রম

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক অভিযানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিপরীতে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করে রোগী আনার প্রমাণ পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি পূর্বে বন্ধ ঘোষণা করা হলেও অভিযানকালে সেটি পুনরায় চালু অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, হাসপাতালের আশপাশে আরও বেশ কয়েকটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

হাসপাতাল পরিচালকের বক্তব্য

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক জানান, প্রতিদিন ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করলেও কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। শয্যা সংকট দেখা দিলে প্রয়োজনে ফ্লোরে কিংবা একই বেডে একাধিক রোগী রেখে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। অতিরিক্ত রোগীর চাপের মধ্যেও চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।

সমাধানে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রাজধানীতে হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে বিভাগীয় শহর, জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ জরুরি। সেখানে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক পরীক্ষাগার, আইসিইউ সুবিধা এবং অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীমুখী রোগীর চাপ অনেকটাই কমে আসবে।

তাদের মতে, চিকিৎসাসেবার বিকেন্দ্রীকরণ, অবৈধ ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি এবং দালাল সিন্ডিকেট নির্মূলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই বর্তমান সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

তিন দিনে তেলের দাম কমল ১৭ শতাংশ

চলমান সংঘাত সাময়িকভাবে স্থগিত থাকার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব...

মোংলায় ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি গ্রেপ্তার

মোংলা থানার একটি ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি লিটন মন্ডলকে (৩৩) গ্রেপ্তার করেছে প...

বোয়ালমারীতে প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণে অন্তস্বত্বা, গ্রেপ্তার আরও ২ 

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে প্রতিবন্ধী এক নারীকে (৪০) ধর্ষণের মামলায় বুধবার (২৯ জুল...

মাটিরাঙায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে বীজ সহায়তা প্রদান  

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে কৃষি প্রণোদনা প্রদান ক...

ড. মুহাম্মদ ইউনূস: করিডোরের কৌশলগত ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে একটু ভালো করে তাকালে দেখা যায় উপরে হিমালয়ের দক্ষিণ...

বেশি ভাত খেলে কি ভুঁড়ি বড় হয়?

শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণে ভাত বা যেকোনো খাবার থেকে অতিরিক্ত ক্যালর...

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তারের শঙ্কা, জাতিসংঘের উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে নতুন করে বিমান হ...

টানা পাঁচ দিন বৃষ্টির আভাস আবহাওয়া অধিদপ্তরের 

আজ থেকে আগামী পাঁচ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময়ে কো...

২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু 

সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে...

জুলাই আন্দোলনে বিএনপি নেতারা গর্তে ছিলেন: রুমিন ফারহানা 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা দাবি করেছেন, জুলাই...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা