যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে বিশ্ববাজার থেকে দেশটির পোশাক আমদানি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এর বড় ঢেউ এসে লেগেছে বাংলাদেশের গায়েও। তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, চীনের মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক জায়ান্ট এবং ভারতের মতো প্রতিযোগীরাও এই বাজারে চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পোশাকের বাজারে এই আকস্মিক মন্দা এবং বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের সাম্প্রতিক অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে এক উদ্বেগজনক চিত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক আমদানির করুণ চিত্র :
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর—এই নয় মাসে মার্কিন মুলুকে পোশাক আমদানির সামগ্রিক চিত্রে বড় ধস নেমেছে। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মোট ৫ হাজার ৬৬৮ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ কম। টাকার অঙ্কে বা আমদানির পরিমাণের দিক থেকেও এই পতনের হার বেশ বড়—প্রায় ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে অবাক করা বিষয় হলো, পণ্যের সামগ্রিক পরিমাণ কমলেও খুচরা পর্যায়ে বা গড় ইউনিট মূল্য সামান্য বেড়েছে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ।
বাংলাদেশের রপ্তানি চিত্র : কমলো আয় ও পণ্যের দাম :
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই নয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে মোট ৬১৪ কোটি ডলারের পোশাক কিনেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া পোশাকের পরিমাণ কমেছে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম সামান্য বাড়লেও বাংলাদেশের রপ্তানি হওয়া পণ্যের গড় ইউনিট মূল্য উল্টো দশমিক ৯৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
সামগ্রিক আমদানির তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি কিছুটা কম হারে কমলেও বাজারের শেয়ার ধরে রাখা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একসময় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ থাকলেও তা সামান্য কমে ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
মাসের ব্যবধানে রপ্তানির অস্থিরতা :
রপ্তানির এই চিত্র বেশ গোলমেলে। মাসভিত্তিক হিসাবে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে দেখা গেছে বড় ধরনের রোলারকোস্টার রাইড। গেল সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশ থেকে ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ কম পোশাক আমদানি করেছে। অথচ এর ঠিক আগের মাসেই অর্থাৎ আগস্টে রপ্তানিতে অভাবনীয় ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ পবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। এক মাসের ব্যবধানে রপ্তানির এই মারাত্মত ওঠানামা ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
চীন ও ভারতের ভরাডুবি, হাসি ফুটছে ভিয়েতনামের মুখে :
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মাঠে সবচেয়ে বড় মার খেয়েছে দুই পরাশক্তি—চীন ও ভারত। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে চীন থেকে মার্কিনদের পোশাক আমদানি হু হু করে কমেছে ২৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ভারতের অবস্থা আরও শোচনীয়; তাদের রপ্তানি পতন ঘটেছে প্রায় ২৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। পাকিস্তান থেকেও আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে অন্য কিছু উদীয়মান অর্থনীতির দেশে। এই মন্দার বাজারেও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে ভিয়েতনাম। মার্কিন বাজারে ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ। এছাড়া কম্বোডিয়া ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়া ২ দশমিক ৮১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে মার্কিন ক্রেতাদের নজর কেড়েছে। চীন ও ভারতের এই বিশাল দরপতনের সুযোগগুলো মূলত লুফে নিচ্ছে এই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো।
সামনে কী অপেক্ষা করছে :
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহিউদ্দিন রুবেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন ও ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর বাজার হারানোর ফলে বাংলাদেশের সামনে বড় ধরনের শূন্যস্থান পূরণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কেবল সস্তায় পণ্য বিক্রির সেকেলে মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটময় মুহূর্তে টিকে থাকতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, প্রিমিয়াম বা উচ্চমূল্যের পোশাকের উৎপাদন বৃদ্ধি, কারখানার উৎপাদনশীলতা উন্নত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রেতার হাতে নিখুঁত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে হবে। অন্যথায় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এই কঠিন লড়াইয়ে টিকে থাকা বাংলাদেশের জন্য আরও দুরূহ হয়ে পড়বে।
সান নিউজ / রাজীব