পাশে রহস্যময় পোস্টার!
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে সাজানো দেয়ালচি
ত্রের মধ্যে একমাত্র কবিগুরুকেই ঢেকে দিল অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা, ঢাকার ঘটনার পর আবারও আলোচনায় 'কালি-রাজনীতি'
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরকে সামনে রেখে সুসজ্জিত খুলনা রেলস্টেশনের দেয়ালে চোখ আটকে যাচ্ছিল নানা রঙের গ্রাফিতিতে। কিন্তু আজ শুক্রবার দুপুরে সেই সৌন্দর্যের মাঝেই দেখা গেল এক বেমানান দৃশ্য। কালো কালিতে ঢেকে দেওয়া হয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি। ঘটনাটি জানাজানি হতেই এলাকায় শুরু হয় চাপা উত্তেজনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে নিন্দার ঝড়।
সৌন্দর্যবর্ধনের মাঝে অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফর উপলক্ষে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) স্টেশনসংলগ্ন দেয়ালগুলোকে নতুন রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। সেখানে জায়গা পায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি, সুন্দরবনের রূপ, ষাটগম্বুজ মসজিদের স্থাপত্য এবং পাটশিল্পের ঐতিহ্য। পাশাপাশি আঁকা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ এই অঞ্চলের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা গুণীজনের মুখচ্ছবি। নতুন সাজের এই দেয়ালচিত্র নিয়ে অনলাইনে প্রশংসার কমতি ছিল না। এর মধ্যেই ঘটল এই ঘটনা।
সবাই অক্ষত, শুধু কবিগুরু ঢাকা পড়লেন
পুরাতন যশোর রোড-সংলগ্ন দেয়ালে সরেজমিনে দেখা যায়, সেখানে ফকির লালন সাঁই, শিল্পী এস এম সুলতান, নজরুল, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি আগের মতোই আছে। অথচ এতগুলো ছবির মধ্যে শুধু রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিকেই বেছে নিয়ে কালি লেপে দেওয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায়, কাজটি ছিল পরিকল্পিত ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে।
ঘটনাস্থলে মিলল দুটি পোস্টার
কালির পাশেই দুর্বৃত্তরা সেঁটে রেখে গেছে দুটি লিফলেট। 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা' শিরোনামের সেই পোস্টারে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে এমন এক স্লোগান, যার মর্মার্থ হলো, তিতুমীরের বাংলায় মুসলমান ও পূর্ব বাংলার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীদের এবং ভারতবন্দনার কোনো স্থান নেই।
কারা, কখন? এখনো অন্ধকারে পুলিশ
ঘটনার সময় সড়কের উল্টো পাশের সব দোকানপাট বন্ধ ছিল। ফলে কে বা কারা কখন এ কাজ করেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। খুলনা সদর থানার ওসি লোকমান হোসেন জানান, বিকেলে বিষয়টি তাদের নজরে আসার পর তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখ করার মতো কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি।
"এটা সংকীর্ণ মনের পরিচয়": কেসিসি প্রশাসক
ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তার ভাষ্য, খুলনায় আসা দর্শনার্থীরা যেন এই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন এবং স্থানীয় শিশু-কিশোরদের চিন্তার জগৎ প্রসারিত হয়, সেই উদ্দেশ্যেই গুরুত্বপূর্ণ দেয়ালগুলোতে এসব ছবি আঁকা হয়েছিল। যারা কালি ঢেলেছে, তারা নিজেদের মানসিক সংকীর্ণতা ও অসুস্থতাই প্রকাশ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের হুঁশিয়ারি: ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ চাই
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক ফোরাম খুলনার আহ্বায়ক কাজল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের কাজকে রাজনৈতিক চশমায় দেখার একটি প্রবণতা চোখে পড়ছে। অথচ তার কবিপ্রতিভা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কারও নেই। তার সাহিত্য ও জীবনদর্শন যুগের পর যুগ ধরে মানুষকে স্বাধীন চিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধের পাঠ দিয়ে আসছে। তার মতে, একদল তরুণকে বিভ্রান্ত করে এসব অশোভন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মোকাবিলায় মতপার্থক্য ভুলে সব পক্ষকে এক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকার পুনরাবৃত্তি?
এই ঘটনা একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। গত ১০ অক্টোবর রাজধানী ঢাকাতেও রবীন্দ্রনাথের একটি গ্রাফিতির মুখে কালি লেপে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় পুলিশ রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াশসহ মোট চারজনকে আটক করে। এবার খুলনার ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কোনো সংগঠিত প্রচেষ্টার অংশ, নাকি আলাদা আলাদা উসকানির ফল? পুলিশের তদন্তের ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন স্থানীয়রা।
সান নিউজ / রাজীব