ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে নতুন করে সহিংসতার বিস্ফোরণে আবারও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান জাতিগত উত্তেজনার মধ্যে সর্বশেষ রক্তক্ষয়ী ঘটনায় অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। এ ঘটনার পর রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিবাদে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরকারি এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
স্থানীয় প্রশাসন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার গভীর রাতে পৃথক দুটি ঘটনায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে এমন এক এলাকায়, যেখানে মেইতেই এবং পাঙ্গাল মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস বেশি। সেখানকার একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হঠাৎ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হলেও পরে তা পাথর নিক্ষেপ ও গোলাগুলিতে রূপ নেয়। এতে কয়েকজন গুরুতর আহত হন। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৪ বছর বয়সী এক যুবকের মৃত্যু হয়।
একই রাতে দ্বিতীয় ও আরও প্রাণঘাতী ঘটনাটি ঘটে ইম্ফল পূর্ব জেলার খামেনলক এলাকায়। স্থানীয়দের দাবি, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পাহাড়ি এলাকায় যাওয়া কয়েকজন গ্রামবাসীর ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই তিনজন নিহত হন।
এছাড়া আরও কয়েকজন আহত হন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। হামলার জন্য উপজাতীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা, যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংগঠনের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা হয়নি।
চারজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নিহতদের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। শত শত মানুষ মরদেহ নিয়ে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে গিয়ে জড়ো হন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। তারা হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার, এলাকার নিরাপত্তা জোরদার এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বিক্ষোভ ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হস্তক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটে। কিছু সময়ের জন্য পুরো এলাকা উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

ভারতের মণিপুর রাজ্যে সহিংসতায় একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় । ছবি এএনআই
এদিকে সহিংসতার খবর পাওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী এন. বীরেন সিং আহতদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। সেখানে তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আহতদের দ্রুত ও সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণ তদন্ত এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। একাধিক বিধায়ক ও রাজনৈতিক নেতা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার সমালোচনা করে বলেছেন, সহিংসতা-প্রবণ এলাকাগুলোতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তারা দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত কিছু ক্যাম্প ও অবস্থান পুনর্বিবেচনারও দাবি জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের মে মাসে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে ভূমি, সংরক্ষণ সুবিধা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বসহ বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে ভয়াবহ জাতিগত সহিংসতায় রূপ নেয়। এরপর থেকে মণিপুরের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। দীর্ঘ এই সংঘাতে ইতোমধ্যে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই সহিংসতা রাজ্যে বিদ্যমান অবিশ্বাস ও বিভক্তিকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
মণিপুরের সাধারণ মানুষ এখন দ্রুত শান্তি ফিরিয়ে আনা, অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায়, সংঘাতের এই নতুন অধ্যায় রাজ্যটিকে আরও অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সান নিউজ / রাজীব