এক নজরে বুরকিনা ফাসোর নতুন সিদ্ধান্ত ও পরিস্থিতি
শাসক: ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার (ক্ষমতা দখল: সেপ্টেম্বর ২০২২)।
মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল: সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহ ও গুপ্তচরবৃত্তির মতো অপরাধে মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে এনে নতুন আইন পাস (২০ অক্টোবর)। ২০১৮ সালে এই বিধান বাতিল করা হয়েছিল।
শেষ মৃত্যুদণ্ড: দেশটিতে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৮৮ সালে।
সাংস্কৃতিক নিষেধাজ্ঞা: নতুন নীতিমালা না হওয়া পর্যন্ত দেশজুড়ে সব ধরনের সুন্দরী প্রতিযোগিতা স্থগিত।
বিকল্প উদ্যোগ: তরুণীদের বিজ্ঞান শিক্ষায় উৎসাহিত করতে ‘হাকিলি মুসো’ নামক জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা চালু।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
পশ্চিম আফ্রিকার অস্থির দেশ বুরকিনা ফাসোতে কঠোর আইন প্রণয়ন ও সাংস্কৃতিক পদক্ষেপে বড় ধরণের পরিবর্তন এনেছে সামরিক সরকার। দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন পার্লামেন্টে সর্বসম্মতিক্রমে নতুন দণ্ডবিধি অনুমোদনের মাধ্যমে পুনরায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশজুড়ে সব ধরনের সুন্দরী প্রতিযোগিতা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সামরিক শাসক ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের এমন সব পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ২০ অক্টোবর দেশটির পার্লামেন্টে পাস হওয়া নতুন আইনে সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং গুপ্তচরবৃত্তির মতো মারাত্মক অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল করা হয়। আইনটির পক্ষে ৭১ জন সংসদ সদস্যই ভোট দেন।
এর মধ্য দিয়ে ২০১৮ সালে দেশটি থেকে মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণ বাতিলের দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এল বুরকিনা ফাসো। উল্লেখ্য, দেশটিতে সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
সরকারের আইনমন্ত্রী এদাসো রদ্রিগে বায়ালা এই কঠোর বিধানের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, বর্তমান সময়ে দেশজুড়ে চরম সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এমন কঠোর আইন আবশ্যক ছিল।
এদিকে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের কয়েক মাস আগে গত ৮ জুন সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে দেশজুড়ে সুন্দরী প্রতিযোগিতা আয়োজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, নতুন নীতিমালা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
দেশের নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সামাজিক অনুশাসনের প্রতি সম্মান রেখেই মূলত এই প্রতিযোগিতার নিয়মকানুন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে সংস্কৃতির এই ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় তরুণীদের সম্পৃক্ত করতে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও নিয়েছে প্রশাসন। গত আগস্ট মাসে গণিত, পদার্থ ও রসায়নে নারীদের আগ্রহ বাড়াতে ‘হাকিলি মুসো’ নামের জাতীয় পর্যায়ের একটি বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
যেখানে ৮৪ জন প্রতিযোগী অংশ নেন এবং বিজয়ী মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশেষ শিক্ষাসাহায্য দেওয়া হয়। খোদ প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ট্রাওরে তরুণীদের বিজ্ঞানমুখী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সামরিক সরকারের এসব একের পর এক নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, নতুন এই মৃত্যুদণ্ডের আইনটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বর্তমান প্রশাসন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের মতে, মৃত্যুদণ্ড মানুষের জন্মগত অধিকারের চরম লঙ্ঘন, যা কোনোভাবেই সংশোধনযোগ্য নয়।
অন্যদিকে, সুন্দরী প্রতিযোগিতা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েও সমাজের বিভিন্ন মহলে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। সরকারের সমর্থক গোষ্ঠী মনে করছে, এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে নারীরা বাহ্যিক আকর্ষণ বাদ দিয়ে পড়াশোনা ও অ্যাকাডেমিক সাফল্যের দিকে বেশি মনযোগী হতে পারবেন।
বিপরীতে সমালোচকদের দাবি, একজন নারীর নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী তার কর্মকাণ্ড বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বুরকিনা ফাসোয় সামরিক শাসন চলছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধারের নামে নেওয়া এসব পদক্ষেপ আদতে নাগরিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের পরিসর কতটা সংকুচিত করছে, তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে চলছে নানা আলোচনা।
সান নিউজ / রাজীব