জাতীয়

সংসদে সুষম গণতন্ত্রের রীতি মানছেন না হাসনাত আবদুল্লাহ

বিশেষ প্রতিনিধি

গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত ক্ষমতার সুষম ভারসাম্য রক্ষা করা। সম্প্রতি নব্য সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থে স্পীকারের রুলিং ও ভঙ্গ করেছেন। বাজেট অধিবেশনে অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করেছেন। এতে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বিঘ্নিত হয়েছে।

আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ হলো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভ।
এই তিনটি স্তম্ভ যখন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বকীয়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তখনই একটি দেশের গণতন্ত্র প্রকৃত অর্থে বিকশিত হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার সুষম ভারসাম্য রক্ষা করা।

এই তিনের যে কোন একটি বিভাগ যখন অন্য বিভাগের এক্তিয়ারে হস্তক্ষেপ করতে চায়, তখন গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই প্রতিটি বিভাগেরই উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সীমারেখা মেনে চলা।

এ ব্যাপারে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার নির্বাহী আদেশ দিয়েছিলেন। সেই আদেশের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
৬-৩ ভোটের এই রায়ে নিম্ন আদালতের স্থগিতাদেশ বহাল রাখা হয়। এটা ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্বাহী আদেশ স্বেচ্ছাধীন চর্চার উপর বড় একটি ধাক্কা।
কোনো সংঘাত ছাড়া আদালতের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই মার্কিন গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রতিফলিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংসদীয় রীতি, আদালতের রায় ও আইনসভার মর্যাদা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা বিচারাধীন বিষয় নিয়ে সংসদে বিতর্ক করার কোনো সুযোগ নেই।

ভারতের লোকসভায় আদালতের রায়ে কেউ নির্দোষ প্রমাণিত হলে, তার বিরুদ্ধে পুনরায় কথা বলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার রুলিং এবং ব্রিটিশ 'হাউজ অব কমন্স'-এর ঐতিহ্য অনুযায়ী— আদালতের রায়ের পর তা নিয়ে আইনসভায় নেতিবাচক আলোচনাকে বিচার বিভাগের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

২৪-এর জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংসদ গঠিত হয়েছে। এই সংসদে অর্ধেকেরও বেশি সদস্য প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়ে এসেছেন, যার মধ্যে জুলাই আন্দোলনের কয়েকজন তরুণ মুখও রয়েছেন। দেশবাসী আশা করেছিল, এই তরুণরা সংসদীয় রীতির সুস্থ চর্চা শিখে নিজেদের দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে গড়ে তুলবেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই হতাশাজনক।

অভিযোগ উঠেছে, কুমিল্লা-৪ আসন থেকে জামায়াত-এনসিপি জোটের মনোনয়নে নির্বাচিত তরুণ সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদীয় রীতিনীতি শেখার চেয়ে সংসদকে বিতর্কিত ও অকার্যকর করার রাজনীতিতে মেতে উঠেছেন। জামায়াত যখন রাজপথে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে উত্তাপ ছড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন সংসদে হাসনাত আবদুল্লাহ অনভিপ্রেত ইস্যু তুলে বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছেন। এটি গণতান্ত্রিক ধারাকে বাধাগ্রস্ত করার একটি অপপ্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

হাসনাত আবদুল্লাহ নিজের সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে বেশ সোচ্চার। যেমন— গত এপ্রিলে তিনি প্রতিটি উপজেলায় ইউএনও বা উপজেলা চেয়ারম্যানদের মতো সংসদ সদস্যদের জন্যও সরকারি গাড়ির সুব্যবস্থা করার দাবি জানান, যাতে ভাড়ায় গাড়ি চড়ে এলাকায় যাওয়ার 'লোকলজ্জা' থেকে বাঁচা যায়। কিন্তু অন্যদিকে তিনি সংসদের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংসদে দাঁড়িয়ে অসত্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছেন, যা সংসদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

২৫ জুনে সংসদে বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ স্পিকারের রুলিং অমান্য করেছেন। জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও আপত্তিকর বক্তব্য দেন। এর মাধ্যমে তিনি গত ২১ জুন স্পিকারের দেওয়া স্পষ্ট রুলিং লঙ্ঘন করেছেন।

স্পিকারের রুলিংয়ে বলা হয়েছিল—"যার পক্ষে সংসদে এসে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই, তার সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা অনুচিত" এবং পূর্বের ওই বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ (Expunge) দেওয়া হয়েছিল।

হাসনাত আবদুল্লাহর এই বক্তব্য সরাসরি সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির পরিপন্থি। সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৭০ নম্বর বিধির (১) উপধারায় বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা, (৬) উপধারায় অশালীন বা কটু শব্দ ব্যবহার এবং (৭) উপধারায় অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানিকর মন্তব্য করার ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। হাসনাতের বক্তব্য এই আইনি বিধিনিষেধ গুলোকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসনাত আবদুল্লাহ তার বক্তব্যে আদালতের রায়কে অমান্য করে আদালত অবমাননা করেছেন। যার নিয়ে তিনি বিষোদগার করেছেন তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালে গুলশান থানার একটি মামলা মামলা হয়। যার নং ২৭(৪)২১। দীর্ঘ শুনানি ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে ২০২৩ সালেই আদালত তাকে অব্যাহতি দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করেন। বাদীপক্ষের নারাজি আবেদনও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ খারিজ করে অভিযুক্তকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে আদালত। আদালতে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া এই বিষয়টি সংসদে টেনে এনে তিনি আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসনাতের এই কর্মকাণ্ড বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। মব বা গণ-উন্মাদনার ওপর ভর করে গণমাধ্যম, অফিস দখল, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের পদত্যাগে বাধ্য করা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক সৃষ্টি করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা কোনো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হতে পারে না।

এটি মূলত ভিন্ন আঙ্গিকে ‘নব্য ফ্যাসিবাদের’ চর্চা। দেশের বেসরকারি খাত ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে এবং মব সংস্কৃতির হাত থেকে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন বাঁচাতে দেশের সকল স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচনে রানা-বারী পরিষদ পূর্ণ প্যানেলে জয়ী

আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জা...

মুন্সীগঞ্জ যুবদল নেতা সোহাগের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং দলের নীতি ও আদর্শ পরিপন্থী ক...

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ বই

মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভি...

সুন্দরবনে ৩ দিনে ঘুরে গেলেন ৩ হাজার পর্যটক

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দূর্গা...

গর্ভবতী নারীকে অবহেলা স্বজনদের, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত সন্তান প্রসব

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চ...

ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচনে রানা-বারী পরিষদ পূর্ণ প্যানেলে জয়ী

আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জা...

রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব মাতৃভূমিতে...

রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব মাতৃভূমিতে...

জাপানি বিদ্রোহী ঔপন্যাসিক রিউ মুরাকামি আর নেই

এক নজরে রিউ মুরাকামি ও তার সাহিত্যিক অবদান

সরকারের ভুলে নীরব থাকবে না বিরোধী দল : ডা. শফিকুর রহমান

বর্তমান সরকারের একের পর এক অনিয়ম, ভুল পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা