মতামত

কৃষকের অধিকার ফিরবে তো কৃষক কার্ডে?

মোঃ শামীম মিয়া

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত যে কৃষি এ কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতিÑসব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃষক। তবুও এক কঠিন বাস্তবতা হলো, এই কৃষক শ্রেণিই এখনো রাষ্ট্রীয় সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনার শিকার।

ভর্তুকি, প্রণোদনা কিংবা কৃষিঋণ এসব নীতিগত সহায়তা প্রণয়ন করা হলেও তার সুষম ও লক্ষ্যভিত্তিক বণ্টন নিশ্চিত করা যায় না। ফলে প্রকৃত কৃষক অনেক সময়ই অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, আর সুবিধা পেয়ে যায় একটি সীমিত প্রভাবশালী গোষ্ঠী। এই প্রেক্ষাপটে “কৃষক কার্ড” কেবল একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; বরং এটি হতে পারে কৃষি ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার একটি কার্যকর উপায়। বাংলাদেশে কৃষকের সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য কোনো জাতীয় ডাটাবেজ নেই এটাই মূল সমস্যার কেন্দ্র। কে প্রকৃত কৃষক, কে আংশিক কৃষি কাজ করেন, আর কে কেবল কাগজে কৃষক এই পার্থক্য স্পষ্ট না হওয়ায় নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জটিলতা তৈরি হয়। স্থানীয় পর্যায়ে তালিকা প্রণয়ন প্রায়ই প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে থাকে, যেখানে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। কৃষক কার্ড চালু হলে এই অস্বচ্ছতা অনেকাংশে দূর হতে পারে, কারণ এটি একটি যাচাইকৃত ও ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত পরিচয় ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা গেলে কৃষি খাতে নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যনির্ভর হবে। কোন এলাকায় কোন ফসল বেশি উৎপাদিত হচ্ছে, কোথায় কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, কোন কৃষক কতটুকু
ঝুঁকিতে আছেন এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হবে দ্রুত, নির্ভুল এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে এবং দুর্নীতির সুযোগ সীমিত হবে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও কৃষক কার্ড একটি যুগান্তকারী ভ‚মিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে। কৃষকরা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পেতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হন, ফলে অনেকেই উচ্চ সুদের অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। কৃষক কার্ড থাকলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সহজেই একজন কৃষকের পরিচয় ও সক্ষমতা যাচাই করতে পারবে। এতে কৃষিঋণ প্রাপ্তি সহজ হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের কৃষির জন্য একটি স্থায়ী ঝুঁকি। প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা পৌঁছাতে দেরি হওয়া, তালিকাভুক্তিতে অনিয়মÑএসব সমস্যা পুরোনো। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত শনাক্ত করা গেলে সহায়তা প্রদানে গতি আসবে।

এমনকি ভবিষ্যতে কৃষি বীমা ব্যবস্থার সঙ্গেও এই কার্ড যুক্ত করা সম্ভব, যা কৃষকদের জন্য একটি নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে। তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক। আমাদের সমাজে কৃষি পেশাকে এখনও অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষিত তরুণরা কৃষিকে পেশা হিসেবে নিতে অনাগ্রহী, কারণ তারা এতে সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা দেখতে পান না। কৃষক কার্ড এই মানসিকতা পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হতে পারে। রাষ্ট্র যখন আনুষ্ঠানিকভাবে একজন কৃষককে স্বীকৃতি দেবে, তখন তার পেশাগত পরিচয় নতুন মর্যাদা পাবে। এটি কেবল ব্যক্তিগত আত্মবিশ্বাসই বাড়াবে না, বরং সমাজে কৃষির অবস্থানকেও দৃঢ় করবে। বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রা এই উদ্যোগকে বাস্তবায়নের জন্য একটি অনুক‚ল পরিবেশ তৈরি করেছে।

জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল সেবাÑএসবের সঙ্গে কৃষক কার্ড সংযুক্ত করা গেলে একটি সমন্বিত সেবা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। এতে সরকার ও কৃষকের মধ্যে দূরত্ব কমবে এবং সেবাপ্রদান হবে আরও কার্যকর। তবে বাস্তবতা হলো, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ নয়। গ্রামীণ অঞ্চলের অনেক কৃষক এখনও ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে পুরোপুরি পরিচিত নন। তাদের জন্য কার্ড ব্যবহার, তথ্য হালনাগাদ রাখা বা ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করা একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এছাড়া তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে পুরো উদ্যোগই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। অতীতে অনেক ভালো উদ্যোগ কেবল দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি এই অভিজ্ঞতা মাথায় রাখা জরুরি।

এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ, ব্যাংকিং খাত এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিকার করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কৃষক কার্ডকে একটি স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে দেখা যাবে না। এটি হতে হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত উদ্যোগ, যা কৃষি খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং কৃষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ ছাড়া এই উদ্যোগের সফলতা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের পথে এগোতে চায়, তখন কৃষি খাতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না। আর এই ভিত্তির কেন্দ্রে রয়েছেন কৃষক। অতএব, সময় এসেছে কৃষকদের নতুনভাবে ভাবার তাদেরকে কেবল উৎপাদক হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার। কৃষক কার্ড সেই স্বীকৃতির একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাতে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা পাবে। শেষ পর্যন্ত বলা যায়, কৃষক কার্ড কোনো সাধারণ পরিচয়পত্র নয়; এটি একটি নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা। এটি কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, জবাবদিহিতা এবং আন্তরিক প্রয়াস থাকলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশে কৃষি খাতে একটি নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে সক্ষম হবে।

মোঃ শামীম মিয়া শিক্ষার্থী, ফুলছড়ি সরকারি কলেজ, আমদির পাড়া, জুমারবাড়ী, সাঘাটা,গাইবান্ধা।
ইমেইল [email protected]

সান নিউজ/আরএ

Copyright © Sunnews24x7
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ বই

মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভি...

চারতলা ভবন থেকে নিচে পড়ে নারীর মৃত্যু

মৌলভীবাজার শহরে অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে আসবাবপত্রসহ...

গর্ভবতী নারীকে অবহেলা স্বজনদের, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত সন্তান প্রসব

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চ...

রাজধানীর বাজারে ছুটির আমেজ, মুরগির দামে ঝাঁজ, ডিমে মিলছে স্বস্তি

পূজার ছুটির আবহ এখনো কাটেনি রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। অনেক স্থানে ক্রেতার উপস্...

লন্ডনে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের ফ্ল্যাট জব্দ

লন্ডনে দেড় কোটি পাউন্ডের ফ্ল্যাট বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন যুক্ত...

ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচনে রানা-বারী পরিষদ পূর্ণ প্যানেলে জয়ী

আজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) ঢাকা সাংবাদিক সমবায় সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। জা...

রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের জোরালো ভূমিকা চায় বাংলাদেশ

মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজস্ব মাতৃভূমিতে...

জাপানি বিদ্রোহী ঔপন্যাসিক রিউ মুরাকামি আর নেই

এক নজরে রিউ মুরাকামি ও তার সাহিত্যিক অবদান

সরকারের ভুলে নীরব থাকবে না বিরোধী দল : ডা. শফিকুর রহমান

বর্তমান সরকারের একের পর এক অনিয়ম, ভুল পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে...

কলা কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে!

এক নজরে কলা চাষের বর্তমান সংকট ও নতুন সম্ভাবনা

লাইফস্টাইল
বিনোদন
sunnews24x7 advertisement
খেলা